হাদিসের শরণাপন্ন হওয়া ব্যতিরেকে কুরআনের অংশবিশেষ বুঝতে পারা বেশ কঠিন

quran open

আমি কুরআন মানি। একইসাথে হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসের গ্রন্থাবলীতে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সঞ্চারিত বর্ণনাসমূহও সঠিক বলে মনে করি। কুরআন ইসলামী জ্ঞানের প্রাথমিক ও প্রধানতম উৎস। পক্ষান্তরে, এই বর্ণনাসমূহ হলো সহায়ক উৎস। জ্ঞানের প্রাথমিক উৎসকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে সহায়ক উৎসের সহায়তা নেওয়া লাগে। আজকের সংক্ষিপ্ত এই লেখায় কুরআনের এমন কয়েকটি আয়াত নিয়ে কথা বলব যা হাদিসের সাহায্য ব্যতিরেকে বুঝতে পারা কষ্টসাধ্য।

১. হাতিওয়ালাদের কুপোকাত হওয়ার কাহিনী:

আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ): “তুমি কি দেখনি তোমার প্রতিপালক হাতিওয়ালাদের সাথে কী ব্যবহার করেছেন? তিনি কি তাদের কৌশল ব্যর্থ করে দেননি? তিনি তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি ছেড়ে দিয়েছিলেন। যারা তাদের উপর পাকা মাটির পাথর নিক্ষেপ করছিল। সুতরাং তিনি তাদের খেয়ে ফেলা ভুসির মতো করে ফেলেন।” [সূরা ফীল ১-৫]

কারা ছিল সেই হাতিওয়ালা যাদের কথা এখানে বলা হচ্ছে? কী ছিল তাদের কৌশল যাকে আল্লাহ ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন? কেন তাদের বিরুদ্ধে ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল?

কুরআনে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায় না। আর উত্তর পাওয়া ব্যতিরেকে সাধারণ একজন পাঠক ও শ্রোতার কাছে সূরাটি তেমন কোনো তাৎপর্য বহন করবে না। কিন্তু, এখানে বর্ণিত ঘটনাটির পটভূমি আমাদের জানা থাকলে এই একই সূরা থেকে আমরা গুরুত্বপূর্ণ অনেক শিক্ষা আহরণ করতে পারব।

হাদিস ও তাফসিরের গ্রন্থাবলীতে ঘটনাটির পটভূমি বর্ণিত হয়েছে এভাবে:

আবরাহা ছিল ইয়েমেনের শাসক, যেখানে সে জমকালো এক গির্জা বানিয়ে ঘোষণা করে দিলো যে এখন থেকে কেউ আর হজ করার জন্য মক্কায় যাবে না। বরং, নতুন তৈরি করা এই গির্জাকেই আল্লাহর ঘর বলে মনে করতে হবে। একথা শুনে আরবদের মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ ও ঘৃণার সৃষ্টি হলো। তারই ফলশ্রুতিতে রাতের অন্ধকারে কেউ একজন গির্জাটির মধ্যে মলত্যাগ করে আসল। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী গির্জাটির একাংশে আগুনও লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরবদের এই প্রতিক্রিয়ায় আবরাহার অহংবোধে আঘাত লাগল। এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলো। বিশাল এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণের উদ্দেশ্যে সে রওনা করল। পথে আরবের কয়েকটি গোত্র তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হলো, কিন্তু পেরে উঠল না। শেষ পর্যন্ত সে মক্কার কাছাকাছি মুগাম্মাস নামক এক স্থান পর্যন্ত পৌঁছে গেল। পরদিন ভোরে যখন কা’বা অভিমুখে সে রওনা হতে চাইল তখন তার হাতি কিছুতেই সেদিকে যেতে চাইল না। ঠিক সেই মুহুর্তে সাগরের দিক থেকে আশ্চর্য ধরণের এক ঝাঁক পাখি উড়ে আসল এবং আবরাহার গোটা বাহিনীর উপর দিয়ে আকাশ ছেয়ে ফেলল। প্রতিটি পাখি তিনটি করে কঙ্কর বহন করছিল। সেগুলো তারা সৈন্যদের উপর বর্ষণ করল। যার উপরই সেই কঙ্কর পড়ল তার শরীর ভেদ করে তা মাটিতে ঢুকে গেল। এই আযাব দেখে সবগুলো হাতি পালাতে শুরু করল। … [তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন থেকে সংক্ষেপিত]

কুরআন নাযিল হওয়াকালীন আরবের অধিবাসীরা ঘটনাটি সম্পর্কে খুব ভালোভাবেই অবহিত ছিল, ফলে তাদেরকে সব কথা ভেঙে বলার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সেই কথাগুলোই পরবর্তীতে হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসের বইতে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

২. যার মাথার অগ্রভাগের চুলগুচ্ছ ধরে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে:

আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ): “তুমি কি দেখেছ সেই ব্যক্তিকে যে বাঁধা দেয় এক বান্দাকে – যখন সে নামায পড়ে? আচ্ছা বলো তো, সে যদি হিদায়াতের উপর থাকে অথবা তাকওয়ার আদেশ করে (তখন তাকে বাঁধা দেওয়া কি পথভ্রষ্টতা নয়?)। আচ্ছা বলো তো, সে (অর্থাৎ, বাঁধাদানকারী) যদি সত্য প্রত্যাখ্যান করে ও মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে সে কি জানে না আল্লাহ দেখছেন? খবরদার! সে নিবৃত্ত না হলে আমি তার মাথার অগ্রভাগের চুলগুচ্ছ ধরে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাব – সেই চুলগুচ্ছ যা মিথ্যাচারী, গোনাহগার। সুতরাং সে ডাকুক তার জলসা-সঙ্গীদের। আমিও ডাকব জাহান্নামের ফেরেশতাদের।” [সূরা আলাক ৯-১৮]

কাকে উদ্দেশ্য করে এত কড়া হুশিয়ারি দেওয়া হলো? কুরআন থেকে তা সরাসরি জানতে পারা যায় না। তবে, হাদিস ও তাফসির গ্রন্থাবলী থেকে আমরা জানতে পারি যে, আমাদের নবী (ﷺ)-এর ঘোরতর শত্রু আবু জাহেলকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলা হয়েছে।

সূরা আলাক-এর এই আয়াতসমূহ যখন নাযিল হয় তখন বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী নির্বিশেষে মক্কার প্রত্যেক বাসিন্দাই বুঝেছিল কাকে এবং কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সতর্কবাণীসমূহ উচ্চারণ করা হয়েছিল। আমরা যেহেতু তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম না তাই এর বিস্তারিত পটভূমি আমাদের জানা নেই। হাদিসের সহায়তা ছাড়া তা জানা সম্ভবও নয়।

৩. আল্লাহর আয়াতসমূহের শ্ত্রু:

আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ): “সেই ব্যক্তির ব্যাপার আমার উপর ছেড়ে দাও যাকে আমি সৃষ্টি করেছি একক করে। আমি তাকে দূর-দূরান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত ধনসম্পদ দিয়েছি, এবং দিয়েছি বহু পুত্র যারা সামনে উপস্থিত থাকে। এবং তার জন্য সকল কিছুর সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছি। তারপরও সে লোভ করে আমি তাকে আরও বেশি দেই। কখনও নয়। সে আমার আয়াতসমূহের শত্রু হয়ে গেছে। অচিরেই আমি তাকে এক কঠিন চড়াইতে চড়াব। তার অবস্থা তো এই যে, সে চিন্তাভাবনা করে একটি কথা তৈরি করল। আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন। সে কেমন কথা তৈরি করল! আবারও আল্লাহ তাকে ধ্বংস করুন। সে কেমন কথা তৈরি করল! তারপর সে নজর বুলাল। তারপর সে ভ্রুকুঞ্চিত করল ও মুখ বিকৃত করল। তারপর সে পিছনে ঘুরল ও অহমিকা দেখাল। তারপর বলতে লাগল, কিছুই নয়, এটা কেবল (যুগযুগ ধরে) বর্ণিত হয়ে আসা জাদু। কিছুই নয়, এটা তো মানুষেরই কথা! অচিরেই আমি তাকে নিক্ষেপ করব জাহান্নামে।” [সূরা মুদ্দাসসির ১১-২৬]

নির্দিষ্ট একজন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে কুরআনের এই কথাগুলো বলা হয়েছে – এটা তো পরিষ্কার। কিন্তু, কে ছিল সেই ব্যক্তি? কী ছিল তার অপরাধ? কুরআনের এতগুলো আয়াত তাকে কেন্দ্র করেই কেন নাযিল হলো? হাদিস গ্রন্থের সহায়তা ছাড়া এব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানা একেবারেই অসম্ভব।

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, তৎকালীন মক্কার অন্যতম ধনাঢ্য ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ওয়ালিদ ইবনে মুগিরাকে ইশারা করে সূরা মুদ্দাসসির-এর এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা হাদিস, তাফসির ও ইতিহাসের বইসমূহে লিপিবদ্ধ করা আছে।

৪. দুইজনের মধ্যে দ্বিতীয়জন:

আল্লাহ বলেন (মর্মার্থ): “তোমরা যদি তার সাহায্য না কর তবে (তাতে তার কোনো ক্ষতি নেই, কেননা) আল্লাহ তো সেই সময়ও তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন কাফিরগণ তাকে বের করে দিয়েছিল এবং তখন সে ছিল দুইজনের মধ্যে দ্বিতীয়জন, যখন তারা উভয়ে গুহার মধ্যে ছিল, তখন সে তার সঙ্গীকে বলেছিল, দুঃখ করো না, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” [সূরা তাওবা ৪০]

কাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল? কেন তাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল? দুইজন বলতে এখানে কাকে ও কাকে বোঝানো হয়েছে? কেনইবা তাদেরকে গুহার মধ্যে আশ্রয় নিতে হয়েছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর কুরআন থেকে পাওয়া যায় না।

তবে, হাদিস গ্রন্থাবলীর সূত্রে আমরা জানি যে, আমাদের প্রিয় নবী (ﷺ)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের কথা এখানে আলোচনা করা হয়েছে। কঠিন এই সফরে তাঁর সঙ্গী ছিলেন আবু বকর আস-সিদ্দীক (রা.)। মক্কা থেকে বের হওয়ার পর তাঁরা দুজনে তিন দিন পর্যন্ত নিকটবর্তী সাওর পাহাড়ের একটি গুহায় আত্মগোপন করে ছিলেন। মক্কার কাফিররা তাঁদের অনুসন্ধানে দিকে দিকে লোক লাগিয়ে দিয়েছিল। একটি অনুসন্ধানী দল সাওর পাহাড়ের সেই গুহা পর্যন্ত পৌঁছেও গিয়েছিল। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে আবু বকর আস-সিদ্দীক (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সেই পরিস্থিতিতে গুহার মধ্যে তাঁদের উভয়ের মধ্যে যে কথোপকথন হয়েছিল তার দিকে কুরআনের এই আয়াতটিতে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

অতএব …

কুরআনে এরকম অনেক আয়াত আছে যার পটভূমি বুঝতে হলে হাদিসশাস্ত্রের শরণাপন্ন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কুরআন যখন নাযিল হচ্ছিল তখন তৎকালীন আরবের অধিবাসীরা এসব আয়াতের পটভূমির সাথে ভালোভাবেই পরিচিত ছিল, ফলে তাদের সামনে সব কথা বিস্তারিত আকারে ভেঙে বলার কোনো প্রয়োজন দেখা দেয়নি। ইশারা থেকেই তারা পুরো কথা ধরতে সক্ষম ছিল। কিন্তু, কুরআন নাযিল হওয়ার প্রায় দেড় হাজার বছর পর আজকের দিনে সেসব আয়াতের পটভূমি আমাদের জানা থাকার কথা নয়। হাদিসের সাহায্য ছাড়া তা জানা সম্ভবও নয়।

Advertisements

__ATA.cmd.push(function() {
__ATA.initSlot(‘atatags-26942-5c4d36a842258’, {
collapseEmpty: ‘before’,
sectionId: ‘26942’,
width: 300,
height: 250
});
});

__ATA.cmd.push(function() {
__ATA.initSlot(‘atatags-114160-5c4d36a84225a’, {
collapseEmpty: ‘before’,
sectionId: ‘114160’,
width: 300,
height: 250
});
});

Updated: January 27, 2019 — 4:43 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

BDislam.info © 2019 Frontier Theme