সুসামঞ্জস্যপূর্ণ সৃষ্টিজগত স্রষ্টার অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ

Milkyway stars

আজকে যদি আমরা চারিদিকে তাকিয়ে দেখি কত ধরনের মানুষ স্রষ্টাকে অস্বীকার করে নানা ধরনের প্রশ্ন, তর্ক, প্রমাণ নিয়ে হাজির হয়েছে, তাহলে আমরা তাদেরকে কয়েকটি দলে ভাগ করতে পারবো—

উঠতি নাস্তিক: “আল্লাহ ﷻ যদি সবকিছু সৃষ্টি করে থাকে, তাহলে তাকে সৃষ্টি করলো কে?”

হতাশাগ্রস্থ নাস্তিক: “সত্যিই যদি আল্লাহ ﷻ থাকে, তাহলে পৃথিবীতে এত দুঃখ, কষ্ট, মুসলিমদের উপর এত অত্যাচার, এত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি হয় কেন? আল্লাহ ﷻ এগুলো হতে দেয় কেন?”

বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী নাস্তিক: “আল্লাহ ﷻ বলে কেউ আছে —এর পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে, সৃষ্টিজগৎ কোনো অতিবুদ্ধিমান সত্তা বানিয়েছে। সুতরাং আল্লাহ ﷻ বলে কেউ নেই।”

আঁতেল নাস্তিক: “আল্লাহ ﷻ ধারণাটা আসলে মানুষের কল্পনাপ্রসূত। মানুষ যখন কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা ব্যাখ্যা করতে পারত না, তখন তারা মনে করত: নিশ্চয়ই কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তা রয়েছে, যে এসব ঘটাচ্ছে। একারণে মানুষ এমন কোনো সত্তাকে কল্পনা করে নেয়, যার কোনো দুর্বলতা নেই। যেমন: তার ক্ষুধা, ঘুম পায় না; সে মারা যায় না; কেউ তাকে জন্ম দেয় না; তার কোনো শরীর নেই যেখানে সে আবদ্ধ; তার কোনো আকার নেই, যা তাকে দুর্বল করে দেবে। এরকম নিরাকার, অবিনশ্বর, অসীম ক্ষমতা ইত্যাদি যত সব কল্পনাতীত গুণ মানুষ চিন্তা করে বের করতে পেরেছে, তার সবকিছু ব্যবহার করে সে এক স্রষ্টা সৃষ্টি করেছে। এর মানে তো এই না যে, স্রষ্টা বলে আসলেই কেউ আছে? এগুলো সবই মানুষের ধারণা।”

ঘৃণাস্তিক: “ধর্মের নামে যে পরিমাণ মানুষ হত্যা হয়েছে, আর অন্য কোনোভাবে এত মানুষ মারা যায়নি। ধর্মের কারণে মানুষে মানুষে ঝগড়া, ঘৃণা, মারামারি, দলাদলি, এক জাতি আরেক জাতিকে মেরে শেষ করে ফেলা —এমন কোনো খারাপ কাজ নেই যা হয় না। পৃথিবীতে যদি কোনো ধর্ম না থাকতো, তাহলে মানুষে-মানুষে এত ভেদাভেদ, এত রক্তারক্তি কিছুই হতো না। যদি আল্লাহ বলে আসলেই কেউ থাকে, তাহলে ধর্মের নামে এত হত্যা কেন হয়? ধার্মিকরা এত অসাধু হয় কেন? যতসব চোর, লম্পট, প্রতারকরা দেখা যায় দাঁড়ি-টুপি পরে মসজিদে নামাজ ঠিকই পড়ে।”

—এগুলো হলো বিজ্ঞানে যারা অ-জ্ঞান, তাদের উর্বর মস্তিষ্ক থেকে বের হওয়া যুক্তি, তর্ক। আবার, বিজ্ঞানী মহলে যারা স্রষ্টা বিদ্বেষী রয়েছেন, তাদের বক্তব্যগুলোও একই রকমের অবাস্তব, বৈজ্ঞানিক পরিভাষার জালে লুকোনো ধোঁকাবাজি—

মহাকাশ বিজ্ঞানী: “মহাবিশ্ব শূন্য থেকে নিজে থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে কিছু ছিল না। এর কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই। ‘কোয়ান্টাম শূন্যতা’ (Quantum Vacuum) থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে।”

পদার্থবিজ্ঞানী: “মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব থেকে। একে কোনো সৃষ্টিকর্তা বানায়নি। এক অতি-মহাবিশ্ব, যাকে মাল্টিভার্স বলা হয়, সেখানে প্রতিনিয়ত সকল ধরনের সৃষ্টিজগত তৈরি হয়। সকল সম্ভাবনা সেখানে বিদ্যমান। এরকম অসীম সংখ্যক মহাবিশ্বের একটিতে আমরা রয়েছি। আরেকটি মহাবিশ্বে হয়ত আমারই মতো একজন রয়েছে, যে আমার থেকে একটু লম্বা। আরেকটিতে আমার থেকে একটু খাটো। আরেকটিতে আমার জন্মই হয়নি। মোট কথা যত কিছুই ঘটা সম্ভব, তার সবই ঘটেছে, ঘটছে এবং ঘটবে।”

দার্শনিক: “মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে। পদার্থ এবং শক্তি অবিনশ্বর। এদের সৃষ্টি বা ধ্বংস হয় না। এদের শুধু রূপান্তর হয়। সময় অসীম।”

জীববিজ্ঞানী: “কোনো অতিবুদ্ধিমান সত্তা মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী বা উদ্ভিদ সৃষ্টি করেনি। এগুলো সবই প্রাকৃতিক নিয়মের ফলাফল। বিবর্তনের ফলে এককোষী প্রাণী থেকে বহুকোষী প্রাণী তৈরি হয়েছে এবং কোটি কোটি বছর ধরে তা উন্নত হতে হতে একসময় বানর বা শিম্পাঞ্জি থেকে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী তৈরি হয়েছে। মানুষ কোনো বিশেষ প্রাণী নয়, শুধুই বানর থেকে বিবর্তনের ফলে একটু উন্নত প্রাণী।”

ইতিহাসবিদ: “যদি কোনো বুদ্ধিমান সত্তা মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতই, তাহলে ইতিহাসে অনেক ঘটনা থাকতো, যা থেকে বোঝা যেত: কোনো বুদ্ধিমান সত্তা সেগুলো ঘটিয়েছে, যা কোনোভাবেই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে ঘটা সম্ভব নয়। এরকম ঘটনা ঘটতে তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে প্রমাণ কী যে, আল্লাহ تعالى বলে সত্যিই কেউ আছে?”

***

এবার দেখা যাক, এই যুক্তি-তর্কগুলো কতখানি বাস্তব এবং বৈজ্ঞানিক—

মহাকাশবিজ্ঞানী: “মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে শূন্য থেকে”

সবচেয়ে অবৈজ্ঞানিক এবং অবাস্তব দাবি হলো: মহাবিশ্ব নিজে থেকেই, শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে, এর কোনো কারণ বা উৎপাদক নেই। একে সহজ ভাষায় বললে, আপনার মা নিজেই নিজেকে জন্ম দিয়েছেন, কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। একদিন তিনি ছিলেন না। তারপর হঠাৎ করে তিনি নিজেই নিজেকে জন্ম দিলেন। এর মানে দাঁড়ায়: কোনো জিনিসের একই সাথে অস্তিত্ব থাকতে পারে, আবার অস্তিত্ব নাও থাকতে পারে এবং সে নিজেই নিজেকে অস্তিত্ব দিতে পারে, যখন কিনা তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না!

P. J. Zwart তার বইয়ে, এটা কত অবাস্তব একটা দাবি, তা দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন: “যদি অবিশ্বাস্য বলে কিছু থাকে, তাহলে সেটা হলো যে, কোনো কিছু শূন্য থেকে উৎপত্তি হতে পারে।” [১]

এরপর, বিজ্ঞানীরা তাদের খেলা পালটিয়ে ফেলেন। প্রফেসর স্টিফেন হকিং, লরেন্স ক্রাউস-এর মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা বলেন, শূন্য বলতে আসলে Quantum Vacuum বা কোয়ান্টাম শূন্যতা বোঝানো হচ্ছে। কোয়ান্টাম শূন্যতা হলো ভৌত কোনো কিছুর অনুপস্থিতি। এটি সব জায়গায় বিরাজমান একটি স্পন্দিত শক্তির ক্ষেত্র।

“এটা ঠিক  ‘শূন্য’ নয়; এটি বিশেষ গঠনের অত্যন্ত সক্রিয় অস্তিত্ব” [২]

তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ‘বিশেষ গঠনের অত্যন্ত সক্রিয় অস্তিত্ব’ আসলো কোথা থেকে? কে একে সৃষ্টি করলো? কীভাবে এটি এমন সব গুণ পেল, যা থেকে এটি এক বিশাল মহাবিশ্ব বিশেষভাবে ডিজাইন করে তৈরি করতে পারে?

এগুলো সবই হচ্ছে স্রষ্টাকে অস্বীকার করার জন্য নানা অজুহাত। মহাবিশ্বের যে সৃষ্টি হয়েছে, সেটার কোনো সঠিক ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দিতে পারছে না। আবার একইসাথে মানতে পারছে না যে, স্রষ্টা বলে কেউ আছেন। একজন বিজ্ঞানীর স্রষ্টায় বিশ্বাস করা মানে ভয়ংকর ব্যাপার। সে বিজ্ঞানী মহলের দুই-তৃতীয়াংশের কাছে হাসির পাত্র হয়ে যাবে। তার প্রজেক্টগুলোর ফান্ডিং হুমকির মুখে পড়বে। তার ক্যারিয়ার অনিশ্চিত হয়ে যাবে। তাহলে কী করা যায়? — ‘কোয়ান্টাম শূন্যতা’ নামের এক মহাজটিল অস্তিত্ব জন্ম দেই। তাহলে বেশ কিছুদিন এটা নিয়ে মানুষকে ঘোল খাওয়ানো যাবে।

পদার্থবিজ্ঞানী: “মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে এক অতি-মহাবিশ্ব মাল্টিভার্স থেকে”

মহাবিশ্বে কিছু অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপ রয়েছে, যা মহাবিশ্বের সবকিছুর অস্তিত্বের মূলে কাজ করে। যেমন, অভিকর্ষ বলের পরিমাপ, পরমাণুর কণিকাগুলোর মধ্যে আকর্ষণ বলের পরিমাপ, ইলেকট্রন এবং প্রোটনের চার্জ, তড়িৎ চুম্বকীয় বলের ধ্রুবক, প্রোটনের ভরের অনুপাতে ইলেকট্রনের সংখ্যা, প্রোটনের সংখ্যার অনুপাতে ইলেকট্রনের সংখ্যা, কার্বন পরমাণুর বিশেষ গঠন ইত্যাদি। এই সবগুলো পরিমাপ যদি আজকে ঠিক যেভাবে আছে, সেভাবে না থেকে সামান্যও এদিক-ওদিক হতো, তাহলে প্রাণ সৃষ্টি কোনোদিন সম্ভব হতো না।

এখন, বিজ্ঞানীরা কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করতে পারছেন না: কীভাবে আমাদের এই মহাবিশ্বটি এত নিখুঁতভাবে, এত পরিকল্পিতভাবে প্রাণের সৃষ্টির জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে তৈরি করা হয়েছে।

যেমন, অভিকর্ষ বল যদি ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগ বেশি বা কম হতো, তাহলে কোনো গ্রহ সৃষ্টি হতো না, প্রাণের সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনাই থাকতো না। ‘বিগ ব্যাং’-এর সময় যে শক্তির প্রয়োজন ছিল, সেটা যদি ১০৬০ ভাগের এক ভাগ এদিক ওদিক হতো, তাহলে অভিকর্ষ বলের সাথে অসামঞ্জস্য এত বেশি হতো যে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়ে বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারতো না। ‘বিগ ব্যাং’-এর মুহূর্তে প্ল্যাঙ্ক সময়ের পর মোট পদার্থের যে ঘনত্ব ছিল, সেটা যদি ১০৫০ ভাগের এক ভাগও এদিক ওদিক হতো, তাহলে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হতো না, যাতে আজকের মতো নক্ষত্র, গ্রহ এবং প্রাণ সৃষ্টি হতো।

—এরকম শত শত ভারসাম্য কীভাবে কাকতালীয়ভাবে মিলে গেল? কীভাবে এগুলো সব নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করা হলো, যেন নক্ষত্র, গ্রহ, পানি, ভারী মৌলিক পদার্থ সৃষ্টি হয়ে একদিন প্রাণের সৃষ্টি হয়, যেই প্রাণ বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়ে একদিন মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণীর জন্ম দিবে? — এর পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা এখনও দিতে পারছেন না।

এমনকি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী Steven Weinberg বলেন: “কি অবাক করার মতো ব্যাপার এটা যে, প্রাকৃতিক নিয়ম এবং মহাবিশ্বের আদি অবস্থা এমন ছিল যে, এগুলো পর্যবেক্ষণ করার মতো একটি প্রাণীর সৃষ্টি তা হতে দেবে। প্রাণ বলতে আমরা যা বুঝি, তা পুরোপুরি অসম্ভব হতো, যদি ভৌত পরিমাণগুলো একটুও অন্য রকম হতো।”

—এতগুলো সূক্ষ্ম ভারসাম্য একসাথে মিলে যাওয়া যে কোনোভাবেই গাণিতিক সম্ভাবনার মধ্যে পড়ে না —এটা বিজ্ঞানীরা বুঝে গেছেন। তখন, তারা এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এক নতুন তত্ত্ব নিয়ে এসেছেন: আমাদের মহাবিশ্ব আসলে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্বের মধ্যে একটি। একেক মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর একেক মান রয়েছে। কিছু মহাবিশ্ব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না, কারণ সেই মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর মানগুলোর মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। আর কিছু মহাবিশ্বে পদার্থবিজ্ঞানের ধ্রুবকগুলোর মান এমন হয় যে, সেখানে কোনোদিন সূর্যের মতো একটি তারা এবং পৃথিবীর মতো একটি গ্রহ তৈরি হতে পারে না। যার ফলে সেই সব মহাবিশ্বে কোনো প্রাণ সৃষ্টি হয় না। পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর যতগুলো সম্ভাব্য সম্ভাবনা হওয়া সম্ভব, সেটা যতই কল্পনাতীত, অবাস্তব একটা ব্যাপার হোক না কেন, যা কিছু হওয়া সম্ভব, তার সবকিছুই সেই মাল্টিভারসের ‘ল্যান্ডস্কেপ’-এ কোথাও না কোথাও হয়েছে এবং হয়ে যাচ্ছে। আমরা মানুষেরা, সেই অসীম সংখ্যক সম্ভাবনাগুলোর একটি, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের হাজার হাজার নিয়ম কাকতালীয়ভাবে, কল্পনাতীত সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করে কোনোভাবে মিলে গেছে এবং যার কারণে আজকে আমরা এই মহাবিশ্বে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে উপলব্ধি করতে পারছি।

তাদের দাবিটা হচ্ছে এরকম: ধরুন কোনো এক সমুদ্রের তীরে বালুতে আপনি একটি মোবাইল ফোন পড়ে থাকতে দেখে তাদেরকে জিগ্যেস করলেন, এই মোবাইল ফোনটা নিশ্চয়ই কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বা বানিয়েছে। তারা বলবে, “না, কোটি কোটি বছর ধরে সমুদ্রের পানি বালুতে আছড়িয়ে পড়তে পড়তে এবং ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাতের ফলে বালুতে রায়ায়নিক বিক্রিয়া হয়ে একসময় এই মোবাইল ফোনটি তৈরি হয়েছে। এটি কোনো বুদ্ধিমান সত্ত্বা বানায়নি, এটি পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলোর অসীম সব সম্ভাবনাগুলোর একটি। এরকম কোটি কোটি সমুদ্রের তীর আছে, যেগুলোর একটিতে হয়তো শুধুই একটা প্লাস্টিকের বাক্স তৈরি হয়েছে, পুরো মোবাইল ফোন তৈরি হতে পারেনি। কিছু তীর আছে যেখানে হয়তো একটা স্ক্রিন পর্যন্ত তৈরি হয়েছে, কিন্তু কোনো বাটন তৈরি হয়নি। আপনি, আমি আসলে সেই অসীম সব সমুদ্রের তীরগুলোর বিশেষ একটিতে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে পদার্থ বিজ্ঞানের সব সম্ভাবনা কাকতালীয় ভাবে মিলে গেছে, যে কারণে এই তীরে একটি সম্পূর্ণ মোবাইল ফোন সৃষ্টি হয়েছে।” —এই হচ্ছে মাল্টিভার্স থিওরি।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, যদি মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয় মাল্টিভার্স থেকে, তাহলে সেই মাল্টিভার্স সৃষ্টি হলো কীভাবে? কীভাবে মাল্টিভার্স এমন সব বৈশিষ্ট্য পেল যে, তা একটি অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মহাবিশ্ব তৈরি করতে পারে? কে শেখালো তাকে বিশাল সব জগত সৃষ্টি করার অতিমহাজাগতিক নিয়ম? — কোনো উত্তর নেই।

দার্শনিক: “মহাবিশ্ব অনন্তকাল থেকে রয়েছে”

Bertrand Russell-এর মতো কিছু বিখ্যাত দার্শনিক এই ধারণাটিকে বেশ জনপ্রিয় করার চেষ্টা করেছেন। তাদের দাবি হচ্ছে, মহাবিশ্ব আদি এবং অনন্ত। এটি অসীম সময় ধরে চলছে এবং চলবে।

‘অসীম’ ধারণাটি আসলে একটি ধারণা মাত্র। বাস্তব জীবনে কোনো ‘অসীম’ বলে কিছু নেই, কারণ অসীম ধারণাটি নানা সমস্যার জন্ম দেয়। যেমন ধরুন, আপনার অসীম সংখ্যক বল রয়েছে। যদি সেখান থেকে দুটি বল নিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে কী দাঁড়ায়? “অসীম – ২ = ?” সংখ্যক বল রয়েছে? যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের গুণতে পারা উচিত কয়টা বল বাকি থাকলো। যদি গুণতে পারি, তার মানে দাঁড়ায় সেটা এমন একটা সংখ্যা, যার সাথে ২ যোগ করলে হঠাৎ করে সেটা অসীম সংখ্যা হয়ে যায় —যা অবাস্তব। সুতরাং, অসীম ধারণাটা একটি ধারণা মাত্র, প্রকৃতিতে এর কোনো অস্তিত্ব নেই। বিখ্যাত জার্মান গণিতবিদ David Hilbert বলেছেন: “বাস্তবে অসীমের কোনো অস্তিত্ব নেই। এর প্রকৃতিতে কোনো অস্তিত্ব নেই, এটা কোনো যুক্তিযুক্ত চিন্তাভাবনার গ্রহণযোগ্য ভিত্তিও দেয় না … অসীমের একমাত্র ভূমিকা হলো এটি একটি ধারণা মাত্র। [৩]  

ধরা যাক, আপনাকে এক মিটার লম্বা একটা লাঠি দেওয়া হলো। এখন আপনাকে বলা হলো, তাকে সমান দুইভাগ করতে। তার একটি ভাগকে আবার সমান দুই ভাগ করতে। তার একটি ভাগ নিয়ে আবার সেটাকে সমান দুই ভাগ করতে।  এভাবে অসীম সময় পর্যন্ত ভাগ করে যেতে হবে। আপনি কি কোনোদিন অসীম-ক্ষুদ্রতম ভাগটি পর্যন্ত যেতে পারবেন? সুতরাং দেখা যায়, অসীম একটি অবাস্তব ধারণা। এর কোনো বাস্তবতা নেই। এরিস্টটল বলেছেন: “অসীম একটি সম্ভাবনা মাত্র, এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব নেই” [৪]

সুতরাং আমরা দেখতে পাই, কোনো ঘটনার পেছন দিকে অসীম সময় পর্যন্ত যাওয়া যায় না। সুতরাং মহাবিশ্ব কখনই অসীম সময় পর্যন্ত ছিল না, মহাবিশ্ব সসীম। সুতরাং মহাবিশ্বের একটি সূচনা রয়েছে। কেউ একজন আছেন, যিনি মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন।

ইতিহাসবিদ: “ইতিহাসে কোনো অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ নেই”

এরচেয়ে বড় মিথ্যা কথা আর কিছু হতে পারে না। এখন পর্যন্ত কেউ প্রমাণ করতে পারেনি কীভাবে আদ, ছামুদ, ফিরাউন জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদ এবং ইতিহাসবিদরা বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের তত্ত্ব দেখাচ্ছেন। কিন্তু যেই ভয়ংকর পর্যায়ের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দরকার এধরনের শক্তিশালী জাতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য, সেটা কীভাবে ঘটা সম্ভব, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এছাড়াও কেউ প্রমাণ করতে পারছে না: কীভাবে বনি ইসরাইল হঠাৎ একদিন ফিরাউনের ভীষণ শক্তিশালী বাহিনীর হাত থেকে ছাড়া পেল। ফিরাউন নিশ্চয়ই একদিন হাসিমুখে তার বনি ইসরাইল দাসদের চলে যেতে বলেনি? বনি ইসরাইলেরও কোনো ক্ষমতা ছিল না ফিরাউনের বাহিনীর বিরুদ্ধে একদিনও টিকে থাকার? তাহলে কীভাবে তারা মুক্তি পেল? কীভাবে তারা ফিরাউন বাহিনীর মতো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনীকে পরাজিত করার অলৌকিক শক্তি রাতারাতি হাসিল করলো?

***

আল্লাহ تعالى প্রতিটি সৃষ্টির ক্বদর অর্থাৎ পরিমাণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

মহাবিশ্বের প্রতিটি পরমাণুর মধ্যে ইলেকট্রন এবং প্রোটনের চার্জ সমান এবং বিপরীত করে দিয়েছেন, যেন ইলেকট্রন পরমাণু ছেড়ে চলে না যায়। আবার এরা যেন একে অন্যকে আকর্ষণ করে একসাথে লেগে ধ্বংস হয়ে না যায়, সেজন্য তিনি এদের মধ্যে নিখুঁত পরিমাণে বিকর্ষণ বল দিয়েছেন, যা এদেরকে একে অন্যের থেকে দূরে রাখে।

প্রতিটি কোষ নিখুঁতভাবে তিনি تعالى তৈরি করেছেন, যেন তা থেকে একটি পূর্ণ উদ্ভিদ বা প্রাণী তৈরি হতে পারে। একটা পুরো মানুষ তৈরি করার ডিজাইন সংরক্ষণ করা আছে মানুষের একটি কোষের মধ্যে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে জটিল যন্ত্র ‘মানব মস্তিষ্ক’ তৈরি করার অকল্পনীয় জটিল ব্লু-প্রিন্ট রাখা আছে খালি চোখে দেখা যায় না এমন ক্ষুদ্র কোষের ডিএনএ-তে।

আমাদের সৌরজগতে তিনি تعالى সূর্য, পৃথিবী এবং চাঁদকে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে একদম জায়গামতো রেখেছেন, যেন পৃথিবীতে বসবাসের যোগ্য তাপমাত্রা, আবহাওয়া, খনিজ পদার্থের চক্র বজায় থাকে এবং প্রচুর পরিমাণে প্রাণের বিকাশ ঘটতে পারে। পৃথিবীকে তিনি নিখুঁতভাবে একটু হেলে দিয়েছেন, যেন ঋতুর পরিবর্তন হয়, যা পৃথিবীকে একদিন মানুষ আসার জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলবে।

চাঁদকে তিনি যথাযথ আকৃতিতে সঠিক দূরত্বে রেখেছেন, যেন চাঁদের মাধ্যমে আমরা মাসের হিসেব করতে পারি এবং একইসাথে এটি পৃথিবীতে জোয়ার, ভাটা এবং প্লেট টেক্টনিক্স সচল রাখে এবং পৃথিবী যেন লাটিমের মত হেলেদুলে ঘুরে চরম আবহাওয়া তৈরি না করে।

বৃহস্পতি গ্রহকে তিনি সঠিক জায়গায় সঠিক আকৃতিতে রেখেছেন, যেন তা সৌরজগতের ভেতরে এবং বাইরে থেকে আসা পৃথিবীমুখী হাজার হাজার ধ্বংসাত্মক ধূমকেতু এবং উল্কা নিজের কাছে নিয়ে পৃথিবীকে রক্ষা করে। এই সবকিছুই দরকার মানুষের মতো একটি প্রাণ যেন একদিন পৃথিবীতে আসতে পারে এবং কোটি বছর টিকে থাকতে পারে।

চাঁদের কারণে যে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়, সেটা একটা বিরাট ব্যাপার। সূর্যের ব্যাস চাঁদের থেকে প্রায় ৪০০গুণ বেশি। যদি সূর্য চাঁদের থেকে প্রায় ৪০০ গুণ দূরে না থাকতো, তাহলে আকাশে সূর্য এবং চাঁদের আকৃতি প্রায় সমান হতো না এবং কোনোদিন পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হতো না। সূর্য এবং চাঁদের আকৃতি এবং দূরত্ব এত নিখুঁত অনুপাতে আল্লাহ تعالى রেখেছেন দেখেই পূর্ণ সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ সূর্যকে একদম সঠিক মাপে ঢেকে ফেলে।

আমরা যেদিকেই তাকাই, অতি ক্ষুদ্র পরমাণু থেকে শুরু করে অকল্পনীয় বিশাল ছায়াপথ —সবদিকেই আমরা নিখুঁত পরিমাপ দেখতে পাই।

***

আল্লাহ تعالى সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি, সৃষ্টিকে তিনি পথও দেখিয়েছেন। কীভাবে তিনি تعالى সৃষ্টিকে পথ দেখান?

Abraham Cressy Morrison, নিউইয়র্ক একাডেমী অফ সাইন্স-এর প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, তার “Man does not stand alone” বইয়ে অনেকগুলো বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনার উদাহরণ দিয়েছেন—

পাখিদের মধ্যে নীড়ে ফেরার একটি প্রবণতা আছে। যেই রবিন পাখিটি আমাদের ঘরের চালে বাসা বানায়, সেই পাখিটি শীতকালে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে দক্ষিণে উষ্ণ অঞ্চলে চলে যায়। তারপর ঠিকই পাখিটি বসন্তকালে একদম ঘরের চালে তার নিজের বাসায় ফিরে আসে। হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে রাস্তা চিনে ফিরে আসার পদ্ধতি কে তাকে শেখালো?

কবুতর অনেক সময় শব্দদূষণের কারণে পথ হারিয়ে ফেললেও, তারপর সেটা যেখানেই থাকুক না কেন, আবার ঠিক তার বাসায় ফিরে যেতে পারে। মৌমাছি হাজার গাছপালা, ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে উড়ে গিয়ে ফুলের রস নিয়ে আবার ঠিকই তার মৌচাক খুঁজে পায়। আজকে আমরা ম্যাপ, মোবাইল ফোনের সাহায্য নিয়ে পথ চিনে নিই। কিন্তু এই কাজ লক্ষ বছর ধরে প্রাণীজগতে বহু প্রাণী করে আসছে। কে শেখালো এদেরকে রাস্তা চিনে ফিরে আসার এই পদ্ধতি, যা মানুষও প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া নিজেরা করতে পারে না?

আকাশে উঁচুতে উড়ে বেড়ানো পাখি শত ফুট উঁচু থেকেও ঘাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকা পোকা, ইঁদুর দেখতে পেয়ে ঝাপ দিয়ে নেমে এসে ধরে ফেলে। মানুষ সম্প্রতি বাইনোকুলার আবিষ্কার করে যেই কাজ করতে পেরেছে, লক্ষ বছর আগে থেকেই প্রকৃতিতে বাইনোকুলার সমৃদ্ধ চোখ বহু প্রাণীর মধ্যে রয়ে গেছে। চোখের লেন্সকে এক বিশেষ ভঙ্গিমায় রাখলে তা দিয়ে বহু দুরের জিনিস দেখা যায়, এই বিদ্যা পাখিকে কে শেখালো?

ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে যদি ঘোড়াকে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়, এটি ঠিকই রাস্তা ধরে হেটে যেতে পারে। রাস্তা এবং তার দুইপাশের তাপমাত্রার সূক্ষ্ম পার্থক্য এর চোখ ধরতে পারে। যে কারণে কোনো দৃশ্যমান আলো না থাকলেও, এটি ইনফ্রারেড তরঙ্গ দেখে রাস্তা বুঝে নিতে পারে। পেঁচা ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যেও বহু দূরে লুকিয়ে থাকা ইঁদুরের গায়ের তাপ থেকে বের হওয়া ইনফ্রারেড আলো দেখে উড়ে গিয়ে নিখুঁত নিশানা করে শিকার করতে পারে। মানুষ সম্প্রতি ইনফ্রারেড চশমা আবিষ্কার করেছে, যা লক্ষ বছর আগে থেকেই প্রকৃতিতে ছিল।  এই প্রাণীগুলো কীভাবে ইনফ্রারেড তরঙ্গ দেখে তা বোঝার জ্ঞান পেল?

মৌমাছিরা তিন ধরনের বিশেষ কক্ষ তৈরি করে— কর্মী মৌমাছিদের জন্য ছোট কক্ষ, পুরুষদের জন্য বড় কক্ষ এবং রাণীর জন্য বিশেষ কক্ষ। এই তিন ধরনের কক্ষ তৈরি করার ডিজাইন এরা কার কাছ থেকে শিখল? এই কর্মী মৌমাছিরা নতুন প্রজন্ম আসার আগেই বিশেষভাবে ফুলের রেণু এবং রস চিবিয়ে, অর্ধেক হজম করে পেটে জমা করে রাখে। তারপর বাচ্চাদেরকে সেই অর্ধেক হজম করা খাবার খেতে দেয়, কারণ বাচ্চারা সরাসরি রেণু এবং ফুলের রস খেতে পারে না। তারপর যখন বাচ্চাগুলো কিছুটা বড় হয়, তখন কর্মী মৌমাছিরা এই চিবানোর কাজ বন্ধ করে দেয় এবং তারপর থেকে শুধু মধু এবং রেণু খায়। বাচ্চাদেরকে অর্ধেক হজম করা খাবার দিতে হবে, না হলে বাচ্চারা মারা যাবে, এই জ্ঞান মৌমাছিকে কে দিলো? যদি একদম প্রথম প্রজন্মের মৌমাছির মধ্যে এই জ্ঞান না থাকতো, তাহলে তো মৌমাছি এক প্রজন্ম পরেই বিলুপ্ত হয়ে যেত। তাহলে এই জ্ঞান একদম প্রথম মৌমাছি কীভাবে পেয়েছিল?

মৌমাছি যখন ফুলের রস, রেণু নিয়ে বাসায় ফিরে আসে, তখন সেটি এক বিশেষ নাচ এবং সাংকেতিক শব্দ তৈরির মাধ্যমে অন্য মৌমাছিদেরকে জানিয়ে দেয় যে, চাক থেকে বের হয়ে সামনের আম গাছের পর ডানে মোড় নিয়ে, করল্লা গাছের নিচে দিয়ে একটি সুড়ঙ্গ ধরে দশফুট উড়ে গিয়ে, তারপর বায়ে মোড় নিয়ে একটি লাউ ঝাড়ের ভেতর দিয়ে পাঁচফুট গিয়ে, ডানে মোড় নিলেই অনেকগুলো ফুল পাওয়া যাবে, যেগুলোতে এখনো যথেষ্ট রস এবং রেণু আছে। এত নিখুঁতভাবে ওড়ার পথ মনে রাখা এবং তা এত নিখুঁতভাবে অন্য মৌমাছিদেরকে জানিয়ে দেওয়ার ভাষা তাকে কে শেখালো?

শুধু তাই না, মৌমাছির চাকের ডিজাইন স্থাপত্যবিদদের জন্য এক বিস্ময়। মৌচাক তৈরি হয় ষড়ভুজ আকৃতির অনেকগুলো মোমের তৈরি ফাঁপা স্তম্ভ একসাথে জোড়া দিয়ে। এই স্তম্ভগুলো মধু ধারণ করে রাখে। এখন, মৌমাছি কেন বৃত্তাকার, ত্রিভুজ, চতুর্ভুজ বা পঞ্চভুজ স্তম্ভ না বানিয়ে ষড়ভুজ স্তম্ভ তৈরি করে? যদি সবচেয়ে কম জায়গায় সবচেয়ে বেশি মধু রাখাই উদ্দেশ্য হতো, তাহলে তো বৃত্তাকার স্তম্ভ তৈরি করলেই সবচেয়ে ভালো হতো। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ষড়ভুজ স্তম্ভ তৈরি করতে মোম খরচ পড়ে সবচেয়ে কম। একইসাথে স্তম্ভগুলোর মাঝখানে কোনো ফাঁকা জায়গা থাকে না, যার কারণে স্তম্ভগুলোর দেওয়াল একে অন্যের সাথে লেগে থাকে। একারণেই মৌচাক এত টেকসই হয়। ষড়ভুজ হচ্ছে সবচেয়ে কম মোম খরচে, সবচেয়ে মজবুত এবং সবচেয়ে বেশি মধু ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত জ্যামিতিক আকৃতি।

আর মৌমাছি শুধু ষড়ভুজই তৈরি করে না, সেই ষড়ভুজের প্রত্যেকটি বাহুর দৈর্ঘ্য হুবহু একই। শুধু তাই না, হাজার হাজার মৌমাছি প্রত্যেকে নিজের মতো স্তম্ভ তৈরি করে। একে অন্যের জন্য অপেক্ষা করে না। কিন্তু তারপরেও তারা প্রত্যেকে একই আকৃতির ষড়ভুজের প্রতিটি বাহু সমান করে স্তম্ভ তৈরি করে। এই বিস্ময়কর জ্যামিতিক জ্ঞান এবং একসাথে কাজ করার শৃঙ্খলা মৌমাছিকে কে শেখালো?

মশা প্রকৃতির আরেক বিস্ময়। যখন ডিম পাড়ার দরকার হয় তখন সঠিক তাপমাত্রা এবং জলীয় বাষ্প আছে এমন জায়গা মশা খুঁজে বের করতে পারে। মশার পেটের কাছে তাপমাত্রা এবং জলীয় বাষ্প মাপার অঙ্গ রয়েছে। কীভাবে মশা জানতে পারল যে, একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা এবং জলীয় বাষ্পে তার ডিমগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারবে? তাপমাত্রা এবং জলীয় বাষ্পের এই ধারণা তাকে কে শেখালো?

মশার ডিমগুলো তার চারপাশের অবস্থা অনুকূল না হলে ডিম ভেঙে মশার বাচ্চা বের করে দেয় না। কীভাবে একটা ডিম তার চারপাশের অবস্থা প্রতিকূল কি না তা বুঝতে পারে? ডিমের মধ্যে এই ‘বুদ্ধিমত্তা’ কে দিলো? মশা তার ডিমগুলো পাড়ার পর সেগুলোকে একসাথে লাগিয়ে একটা ভেলার আকৃতি দেয়। এর ফলে ডিমগুলো একসাথে লেগে থেকে পানিতে ভেসে থাকতে পারে, পানির স্রোতে হারিয়ে যায় না। ডিমগুলোকে যদি চাপ দিয়ে পানির ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেও এটি মুহূর্তের মধ্যে ভেসে ওঠে এবং ঠিক যেদিকটা উপরের দিকে ছিল, সেটাই উপরে থাকে। ডিমগুলো একটি ভেলার আকৃতি দিলে যে সেটা সবচেয়ে ভালোভাবে ভেসে থাকতে পারবে আর চারকোণা বা গোলাকৃতি হলে যে পারবে না, তারপর ডিমের নীচে যে একটু ফাঁকা জায়গায় বাতাস আটকে রাখলে তা পানিতে ডুবে যাবে না—এই প্রকৌশল জ্ঞান মশাকে কে শেখালো?

ইউরোপ, আমেরিকার হাজারো নদীনালা, খালবিলে থাকা ইল পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর সবাই ঝাঁকে ঝাঁকে হাজারো মাইল সাঁতরে বারমুডার অতল গহীন সমুদ্রে চলে যায়। সেখানে তারা বাচ্চা জন্ম দেয়, তারপর মারা যায়। এই বাচ্চাগুলো সেই অতল গহীন সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই কখনো দেখেনি। কিন্তু এরাই একসময় হাজার মাইল লম্বা ভ্রমণ শুরু করে তাদের বাবা-মা যেই নদী, খাল, বিল থেকে এসেছিল, ঠিক সেই নদী, খাল, বিলে ফিরে আসে। এই বাচ্চাগুলো সমুদ্রের ভীষণ স্রোত, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, হাজারো প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে হাজার মাইল সাঁতরে ঠিকই বাবা-মার ভিটেমাটিতে ফিরে আসে। সেখানে তারা বড় হয়। তারপর পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পর বারমুডা যাওয়ার যাত্রা শুরু করে। কোনোদিন কোনো আমেরিকান ইল ইউরোপের পানিতে ধরা পড়েনি। কোনো ইউরোপিয়ান ইলকে কখনো আমেরিকার পানিতে দেখা যায়নি। শুধুই কিছু অণু-পরমাণু দিয়ে যদি ইল তৈরি হয়, তাহলে ইল-এর মধ্যে এই দিকনির্দেশনা এবং এত বড় যাত্রা করার ইচ্ছাশক্তি আসল কীভাবে?

প্রতিটি প্রাণ কোষ দিয়ে তৈরি। কোষগুলো বিভাজনের মাধ্যমে সংখ্যা বৃদ্ধি করে। নিজেদেরকে সময়মতো, জায়গামতো পরিবর্তন করে বিভিন্ন অঙ্গের জন্ম দেয়। কীভাবে মানুষের ডান কানের কোষগুলো জানে যে, সে ডান কানের ঠিক কোন জায়গায় আছে এবং এখন তাকে কোনদিকে মোড় নিতে হবে, যেন কানের ভাঁজ সঠিকভাবে তৈরি হয়? বাম কানের কোষ কীভাবে জানে যে, তাকে ডান কানের বিপরীত দিকে মোড় নিতে হবে? কীভাবে আঙ্গুলের ডগার কোষগুলো জানে যে, সে আঙ্গুলের ডগায় আছে, এখন তাকে পরিবর্তন হয়ে নখের মতো শক্ত কোষে পরিণত হতে হবে?

মানুষ যখন মায়ের গর্ভে থাকে, তখন কীভাবে দুইশ কোটি তিন লক্ষ পঁয়ষট্টিতম কোষটি সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাকে এই জায়গা থেকে একটি কিডনি তৈরি করা শুরু করতে হবে? কে কিডনির  কোষগুলোকে বলে যে, যথাযথ আকৃতিতে কিডনি তৈরি করা শেষ, এখন থামো, আর বড় করার দরকার নেই? একটি কোষ কোথায় আছে, কী অবস্থায় আছে, এরপর তাকে কী করতে হবে, তার অবস্থান অনুসারে ডিএনএ-এর কোন অধ্যায়গুলো বাদ দিয়ে যেতে হবে, কোন অধ্যায়গুলো অনুসারে কাজ করতে হবে —এত কিছু উপলব্ধি করার মতো অত্যন্ত জটিল যন্ত্রাদি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এত ছোট জায়গায় কীভাবে তৈরি হলো?

কিছু প্রজাতির পিঁপড়া মাশরুম চাষ করে। এদের ঢিবির ভেতরে তারা মাশরুমের জন্য যথাযথ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা বজায় রেখে মাশরুমের বাগান গড়ে তোলে। একইসাথে এরা শুঁয়োপোকা এবং উকুনের ফার্ম তৈরি করে, যেভাবে কিনা মানুষ গরু, ছাগলের ফার্ম তৈরি করে। এই পোকাগুলো থেকে এরা মধুর মতো একধরনের খাবার সংগ্রহ করে নিজেরা খায়। পিঁপড়ের মতো একটা ক্ষুদ্র প্রাণীকে কৃষিবিদ্যা এবং পশুপালন শেখালো কে?

—প্রকৃতিতে এরকম হাজার হাজার ঘটনা দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে, সবকিছু তো অণু-পরমাণু দিয়ে তৈরি, কিন্তু অণু-পরমাণুর ভেতরে তো কোনো জ্ঞান নেই? কোটি কোটি অণু, পরমাণু একসাথে করলেও জটিল জ্ঞান তৈরি হয় না। তাহলে এইসব জটিল জ্ঞানের উৎস কী?

উত্তর একটাই— একজন বুদ্ধিমান স্রষ্টা থাকতে বাধ্য, যিনি শুধু অণু, পরমাণু দিয়ে জীব সৃষ্টি করেন না, একইসাথে তিনি তাদেরকে জ্ঞান দেন, পথ দেখিয়ে দেন।

তথ্যসূত্র:
[১] [P. J. Zwart, About Time (Amsterdam and Oxford: North Holland Publishing Co., 1976), pages 117-19] [২] John Polkinghorne and Nicholas Beale. Questions of Truth. 2009, page 41

[৩] David Hilbert. On the Infinite, in Philosophy of Mathematics, ed. with an Intro. by P. Benacerraf and H. Putnam. Prentice-Hall. 1964, page151.

[৪] Aristotle, “Physics 207b8” http://classics.mit.edu/Aristotle/physics.html

মূল লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় “কুরআনের কথা” ওয়েবসাইটে, প্রথমদ্বিতীয় খন্ড আকারে।   

আরও পড়ুন: 

Advertisements

__ATA.cmd.push(function() {
__ATA.initSlot(‘atatags-26942-5c7b5b118cc2a’, {
collapseEmpty: ‘before’,
sectionId: ‘26942’,
width: 300,
height: 250
});
});

__ATA.cmd.push(function() {
__ATA.initSlot(‘atatags-114160-5c7b5b118cc2c’, {
collapseEmpty: ‘before’,
sectionId: ‘114160’,
width: 300,
height: 250
});
});

Updated: March 3, 2019 — 4:41 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *