সময়ঘড়ি

সূরা আসর আল কুরআনের ১০৩ নম্বর সূরা। বোধসম্পন্ন মানবজাতিকে উজ্জীবিত করার জন্য এই সূরা এক বিরাট মাইলফলক। আমি কোন ইসলামি বিশেষজ্ঞ নই যে সুরা আসর এর তাফসীর করতে বসেছি, শুধু তাদের জন্যই এই লেখা যাদের মূল্যবান সময় নেই আল্লাহ্‌  ও রাসুল (সঃ)এর বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন করার। নিম্নোক্ত মূল্যবান সব কথাই আল-কুরআন ও বিভিন্ন তাফসীর থেকে উদ্ধৃত। ব্যাখ্যার সময় শুধু নিজের আবেগকে ব্যবহার করেছি। ভাববার সময় থাকলে অন্তরচক্ষু দিয়ে একবার ভেবে দেখুন।

১ নং আয়াত

সময়ের শপথ/কসম

২নং আয়াত

নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।

প্রথমে জেনে নেওয়া প্রয়োজন আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা কেন এবং কখন কসম উচ্চারণ করেন?

আরব সংস্কৃতিতে শপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম আল রাযীর মতে, কুরআন আরবিতে প্রকাশ করা হয়েছে এবং আরবদের দাবি প্রমাণ করার জন্য শপথ গ্রহণের প্রথা ছিল। তাই আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক শৈলী ব্যবহার করেছেন। শপথ শুধুমাত্র জোর প্রদান, মনোযোগ আকর্ষণ এবং অনুমোদন গ্রহণের জন্য করা হয়। শপথ  উল্লিখিত বিষয়টির গুরুত্ব দেয় কিন্তু শপথ নিজেই জোর বিন্দু নয়। শপথ গ্রহণের উদ্দেশ্যগুলি প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন সময়ে, প্রেক্ষিতে বিভিন্ন অর্থ/ ভাব প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে- আল্লাহর মহিমা প্রদর্শন করা, যুক্তি প্রয়োগ, নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর গভীর চিন্তা করে প্রয়োগ করা, প্রমাণ করা, শপথ করা জিনিসটির প্রতি শ্রদ্ধা করা।

এখানে প্রণিধানযোগ্য বিষয় এই যে বিষয়বস্তুর সাথে সময় বা যুগের কি সম্পর্ক, যার কসম করা হয়েছে?

কসম ও কসমের জওয়াবের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। অধিকাংশ তাফসীরবিদ বলেন, মানুষের সব কর্ম, গতিবিধি, উঠা-বসা ইত্যাদি সব যুগের মধ্যে সংঘটিত হয়। সূরায় যেসব কর্মের নির্দেশ দেয়া হয়েছে সেগুলোও এই যুগ-কালেরই দিবা-রাত্রিতে সংঘটিত হয় এবং হবে। এরই প্রেক্ষিতে যুগের শপথ করা হয়েছে (সাদী, ইবন কাসীর) কোন কোন আলেম বলেন, আল্লাহ্‌ তা’আলার মহত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব, প্রজ্ঞা ও কুদরতের প্রমাণ-নিদর্শন সময় বা যুগেই রয়েছে, তাই এখানে সময়ের শপথ করা হয়েছে। (মুয়াসসার, বাদায়িউত তাফসীর)

আসর অর্থে আমরা যা বুঝি, তা হলো বিকালবেলা, যে সময় আমরা সাধারণত বৈকালীন সালাত আদায় করি।বাস্তবে আসর আরবি অভিধান অনুযায়ী অনেক অর্থ বহন করে প্রাসঙ্গিক অবস্থার প্রেক্ষিতে। যেমন- কাল, মহাকাল, সময়, ঘণ্টা, যুগ ইত্যাদি। এখানে আসর সময় অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা পুরো মানবজাতিকে সময়ের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য শপথ বা কসমের উল্ল্যেখ করেছেন।

সময়ের গুরুত্ব অনুধাবনের ব্যাপারে অনেক বিশিষ্ট গুণীজন অনেক উপসংহার টেনেছেন, কিন্তু কখনই বলেন নাই যে মানুষ বাস্তবিকই ক্ষতিগ্রস্ত। দৈনন্দিন চব্বিশ ঘণ্টা একটা মানুষ কিভাবে ব্যয় করে তাঁর ফিরিস্তি তো সে নিজেই রাখতে পারে এবং তার মধ্যে ইবাদতটুকুর সময় বের করে দেখলেই বুঝতে পারবে কতখানি সময় সে নিজের জন্য ব্যয় করেছে।

অথচ আল্লাহ্‌ সুবহানু ওয়া তা’আলা বলেন:

আমার ইবাদত করার জন্যই আমি মানব ও জিন জাতি সৃষ্টি করেছি। [সূরা আয যারিয়াত :(৫৬)]

মানুষ শব্দটি একবচন। এখানে মানুষ বলে সমস্ত মানবজাতিই উদ্দেশ্য। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ছোট, বড় সবাই এই কাতারে। তাৎপর্য হলো মানুষ অর্থে কাফের মুশরিক তো আছেই, মুসলমানদেরও একটা অংশ এর আওতাভুক্ত। সময় অতিক্রান্তশীল, বহমান, বিদায়কালিক। এসব কিছুই আবার বয়সের সাথে ক্রিয়াশীল। অতএব বুঝতেই পারছেন সময় হাত থেকে বের হয়ে যাচ্ছে আর মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্তের পাল্লা ভারী হচ্ছে। তা এই দুনিয়ায়ে যেমন পরকালতো আরও ভয়াবহ।

ইবনু মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, নবী (সাঃ) বলেছেন:

কিয়ামত দিবসে পাঁচটি  বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আদম সন্তানের পদদ্বয় আল্লাহ্‌ তা’আলার নিকট হতে সরতে পারবে না। এগুলো হলো-(ক) তার জীবনকাল সম্পর্কে, কিভাবে অতিবাহিত করেছে? (খ) তার যৌবনকাল সম্পর্কে, কি কাজে তা বিনাশ করেছে? (গ) তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে, কোথা হতে তা উপার্জন করেছে? (ঘ) এবং তা কি কি খাতে খরচ করেছে? (ঙ) এবং সে যত টুকু জ্ঞান অর্জন করেছিল সে অনুযায়ী কি কি আমল করেছে? (সূনান আত তিরমিজী ২৪১৬)

তাই পাঁচটি বিষয় শেষ হওয়ার আগেই পাঁচটি বিষয় গ্রহণ করুন। আপনার যৌবন, বৃদ্ধ হওয়ার আগে ; আপনার স্বাস্থ্য, অসুস্থ হুওয়ার আগে; আপনার সম্পদ, গরীব হওয়ার আগে; আপনার অবসর সময়, ব্যস্ত হওয়ার আগে সময় এবং আপনার জীবন, আপনার মৃত্যুর আগে।

ইমাম আলী (রাঃ)  বলেছেন:

মানুষ যদি দেখতো  যে তার মৃত্যু কত দ্রুত  তাকে পাকড়াও করছে তবে সে উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ঘৃণা করবে এবং বিশ্বের উপাসনা করা ছেড়ে দিবে।

ইমাম আলী (রা:) আরও বলেছেন:

আপনি মৃত্যু শিকারের এক খেলায় আচ্ছন্ন আছেন। যদি আপনি দাঁড়িয়েও থাকেন তবে এটি আপনাকে ধরে ফেলবে আর আপনি যদি দূরে পালিয়েও যান এটি আপনাকে অতিক্রম করবে।

ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে,  রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন-

 দুটি নিয়ামত আছে যে ব্যাপারে বেশিরভাগ লোক ধোঁকায় নিপতিত। তা হলো সুস্বাস্থ্য ও অবসর সময়। (সূনান আত তিরমিজী ২৩০৪)

৩নং আয়াত

কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের।

এ আয়াতের বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা অনেক অর্থবোধক। এখানে পুরো মানবজাতির পরকালের নাজাতের সবগুলো সুত্রের উল্লেখ করা হয়েছে। মানবজাতি যে ক্ষতির মধ্যে আছে তা থেকে উত্তরণের পথ বলে দেয়া হয়েছে। এই ক্ষতির কবল থেকে কেবল তারাই মুক্ত যারা চারটি বিষয় নিষ্ঠার সাথে পালন করে— ঈমান, সৎকর্ম বা আ’মাল সালেহা, অপরকে সত্যের উপদেশ বা হক এবং সবরের উপদেশ দান। দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মহা উপকার লাভ করার চার বিষয় সম্বলিত এ ব্যবস্থাপত্রের প্রথম দুটি বিষয় আত্মসংশোধন সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয় দুটি বিষয় অপর মুসলিমদের হেদায়েত ও সংশোধন সম্পর্কিত। (সাদী)

উপরোক্ত আলোচনার সারাংশ একটি হাদিস দিয়ে শেষ করছি যা আশা করি আমাদের সবাইকে আলোড়িত করবে। আব্দুল্লাহ ইবনে হিসান আবু মদীনাহ বলেন,

রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহাবীগণের মধ্যে দু ব্যক্তি ছিল, তারা পরস্পর মিলে একজন অন্যজনকে সুরা আসর পাঠ করে না শুনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতেন না। (তাবরানী, মু’জামুল আওসাত ৫১২০, মু’জামুল কাবীর ২০/৭০,বাইহাকী, সু’আবুল ঈমান ৯০৫৭, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১০/২৩৩, ৩০৭)


মিজানুর রহমান সিদ্দীকি

Updated: January 11, 2020 — 11:16 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *