সংগোপনে করা আমল

অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ইমান হ্রাস পেয়েছে। দ্বীনের পথে হাঁটার শুরুর দিকে ইবাদতের মিষ্টতা যতটা অনুভব করতাম এখন তার ছিটে ফোঁটাও নেই। নফল সালাতের পরিমাণ কমতে কমতে এখন শুধুমাত্র ফরয সালাতটাই অবশিষ্ট আছে। কুরআন মুখস্থ  করার প্রচেষ্টায় ভাটা পড়েছে। শুধুমাত্র রমাদান মাসেই কুরআন তিলাওয়াত করা হয়। ইবাদতের পরিমাণ কমে যান্ত্রিক কর্মে পরিণত হয়েছে। এখন যতই দিন যাচ্ছে পাপ কাজে জড়িয়ে পড়া ততই সহজ হয়ে যাচ্ছে। এসবই দুর্বল ইমানের লক্ষণভাবছেন, তাহলে ইমান বাড়ানোর উপায় কি?

একটা উপায় অবশ্য আছে। একান্তে বসে আপনার করা এমন একটা নেক আমলের কথা স্মরণ করুন যা কেউ জানে না। আপনার পরিবার, বন্ধু এমনকি জীবনসঙ্গীও না, শুধুমাত্র আল্লাহ ছাড়া। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

তোমাদের মধ্যে যে গোপনে আমল করার সামর্থ্য রাখে, সে যেন তা করে।

এমন কিছু সময় আছে যখন আমাদের লোকচক্ষুর আড়ালে যে কোন কাজ করা কঠিন হয়ে পড়ে। হতে পারে রাস্তায়, মসজিদে, বাড়িতে বা সোশ্যালমিডিয়ায়। চারপাশে অনেক মানুষ পরিবেষ্টিত থাকলেও সবসময়েই আমরা একটি আমল অন্যদের থেকে আড়ালে করতে পারি, তা হলো আমাদের অন্তরের আমল। লোকেরা আমাদের বাহ্যিক আমল দেখতে পেলেও আমাদের অভ্যন্তরীন আমল দেখতে পায় না। আলেমগণ উদাহরণের মাধ্যমে খুব সুন্দরভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ধরুন, পাশাপাশি দুজন ব্যক্তি দাঁড়িয়ে একই রকম পদ্ধতিতে সালাত আদায় করছেন। কিন্তু তাদের ইখলাসের তারতম্যের কারণে তাদের একজন পেতে পারেন পর্বতসম প্রতিদান আর অন্যজনেরটি হয়তো বা নেহাতই ছুচোর তৈরি নগণ্য ঢিবির সমান প্রতিদান।

এই দৃষ্টিকোণে বলা যায়, এ ধরনের উন্মুক্ত অন্তরের আমল গঠনগতভাবে নামহীন হতে পারে। এটা এখানে আমাদের আলোচ্য বিষয় নয় কারণ আমরা কোন না কোনভাবে এহেন আমল করি। বরং আমাদের দৃঢ় ভাবে সে ধরনের গোপন আমলে অভ্যস্ত হওয়ার চেষ্টা করা উচিৎ যেটায় আমাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রিয়াশীল, অথচ তা মানুষের দৃষ্টি ও আশার অনুধাবনের বাইরে, শুধুমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কেউ তা জানতে পারে না। এটা সেই আমল যা আমাদের ইখলাস বৃদ্ধি করে। এটা সেই আমল যা শুধু আল্লাহর জন্য এবং এতে কোনভাবেই রিয়ার (লোক দেখানো আমল) সংমিশ্রণ ঘটে না। এটা সেই আমল যা আমাদের অন্তরের ইমানের নূর প্রজ্বলিত করতে পারে, আল্লাহ তাআলার সাথে আমাদের সম্পর্ক নবায়ন করে এবং ইবাদতের মধুরতার স্বাদ পুনরুজ্জীবত করে। এটা সেই আমল যেখানে প্রভু এবং বান্দার মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা থাকেনা। এটাই গোপন আমল।

গোপন আমল সম্পর্কে কুরআন এবং হাদীসের বাণী

কিছু সংখ্যক হাদীসে গোপনে আমলকারীর জন্য বিশেষ পুরস্কার ও মর্যাদার কথা বলা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ধর্মভীরু, নিজের অবস্থার উপর সন্তুষ্ট ও লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা বান্দাদের ভালবাসেন।

তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )আরও বলেন,

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, রোজা ব্যতীত বনি আদমের প্রত্যেক নেক আমলই তার জন্য, কিন্তু রোজা শুধু আমার জন্য, আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।

আল্লাহ সাত শ্রেণীর লোককে ক্বিয়ামাতের দিন তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না। যে ব্যক্তি গোপনে সাদাকাহ করে। এমনকি তার বাম হাত জানে না ডান হাত কি খরচ করছে, যে ব্যক্তি নির্জনে আল্লাহর স্মরণকালে তার দু’চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।

হে লোক সকল! তোমরা নিজ নিজ বাড়িতে নামায পড়। কারণ, ফরয নামায ব্যতীত পুরুষের উত্তম নামায হল যা  সে নিজ বাড়িতে পড়ে থাকে।

নফল সালাত জামায়াতে পড়ার চেয়ে বাড়ীতে আদায়ের সওয়াব বেশি। ঠিক যেমন ফরয সালাত একাকী পড়ার তুলনায় জামায়াতের সাথে পড়া উত্তম।

ওহাব ইবনে মুনাব্বিহ (রহঃ) বলেন,

হে বৎস! তুমি ইখলাসপূর্ণ গোপন আমল দ্বারা মহান আল্লাহর আনুগত্যকে একনিষ্ঠ করে তোলো, যা দ্বারা মহান আল্লাহ্‌ তোমার প্রকাশ্য আমলকে সত্যায়িত করেন। ভেবো না প্রকাশ্যে আমল গোপন আমল থেকে সুফলদায়ক। কেননা গোপনীয়তার সাথে প্রকাশ্যের উপমা হলো গাছের সাথে মূলের উপমার অনুরূপ। প্রকাশ্য হলো গাছের পাতা এবং গোপনীয়তা হলো মূল। মূল যদি পচে যায় গাছটা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। মূল যদি ঠিক থাকে বৃক্ষ ঠিক থাকে, ফল ও পাতা সব ঠিক থাকে। কাজেই গাছের মূল যতক্ষণ দৃষ্টির আড়ালে গোপন থাকে ততক্ষণ তার প্রকাশ্য অঙ্গ নিরাপদ থাকে। দ্বীন, ইলম এবং আমলও অনুরূপ। একইভাবে একজন মানুষের দ্বীন ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক পথে থাকে যতক্ষণ তার অন্তরের (লুকায়িত) অবস্থা থাকে সত্যাবলম্বী এবং এটা তার আল্লাহর জন্য করা বাহ্যিক আমলের সত্যায়ন করে। তাই মূল যেভাবে গাছের কাজে লাগে তেমনি লুকায়িত আমলও তার প্রকাশ্য আমলের গভীরতা বৃদ্ধি করে। যদিও তার (গাছের) জীবনীশক্তি মূলের দিক থেকে আসে। কেননা শাখা-প্রশাখা হল গাছের সৌন্দর্য। আর গোপনীয়তা হল দ্বীনের ভিত্তি। তার সঙ্গে প্রকাশ্য যোগ হয়ে দ্বীনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে যদি মুমিন তার দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি ব্যাতীত অন্য কিছু কামনা না করে।

লুকায়িত আমল এবং গোপনে আমল করার মধ্যে পার্থক্য

লুকায়িত আমল এবং গোপনে আমল করার মাঝে সূক্ষ পার্থক্য বিদ্যমান। প্রত্যেকটি গোপন আমলই লুকায়িত আমল হিসেবে গণ্য করা হয় কিন্তু সব লুকায়িত আমল গোপন আমল নয়। লুকানো আমল হচ্ছে তাই যা মানুষের দৃষ্টির আড়ালে করা হয় কিন্তু অন্যরা জানে যে একটি নির্দিষ্ট সময়ে আমলটি করা হয়। যেমন একজন ব্যক্তি ঘরে একাকী নামাজ পড়ে কিন্তু পরিবারের অন্য সদস্যরা জানে সে নামাজ পড়ছে। একজন ব্যক্তি রোজা রেখেছে তার স্ত্রী জানে সে রোজা রেখেছে। অপরদিকে গোপন আমল হলো তাই যা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কেউ জানে না এবং মানুষের চিন্তাভাবনা এবং দৃষ্টির আড়ালে করার চেষ্টা করা হয়। আমাদের পূর্বসূরি আলেমদের গোপন আমলের কয়েকটি উদাহরণ নীচে উল্লেখ করা হল। আমরা কেবল কিছু ঘটনাবলী থেকে তাদের আমলের কথা জানতে পেরেছি।

গোপনে সালাত আদায়

দুহা বারাতের নামাজ গোপন আমলের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে কিন্তু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে অন্য কেউ যেন তা দেখতে বা জানতে না পারে। কথিত আছে, আইয়্যুব আস সাখতিয়ানি(রহঃ) সারা রাত নামাজ পড়তেন । লোকদের কাছ থেকে লুকানোর জন্য সকালে লোকদের দেখিয়ে এমনভাবে হাই তুলতেন যেন তারা বুঝতে পারে তিনি এই মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন।

জ্ঞান অর্জন

কতিপয় আলেমের মতে, জ্ঞান অর্জন হল গোপন ইবাদত এবং তা অন্তরের আমলের অন্তর্ভুক্ত। কারণ জ্ঞানই সর্বোত্তম ইবাদত যা একজন ব্যাক্তিকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে আসে। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রাঃ) বলেন, “তোমরা জ্ঞানার্জন কর, কেননা আল্লাহর উদ্দেশ্যে জ্ঞানার্জনের অর্থ তাকে ভয় করা। জ্ঞানের অনুসন্ধান করা ইবাদত বিশেষ।”

ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেন, “জ্ঞান হল অন্তরের ইবাদত, গোপন ইবাদত এবং আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার আধ্যাত্মিক রূপ। ঠিক যেমন ধর্মীয় আচার-রীতি। শারীরিক অপবিত্রতা থেকে পবিত্রতা অর্জন ব্যাতীত সালাত বৈধ হয় না, একইভাবে মন্দ আচরণ এবং মন্দ স্বভাব থেকে নিজেকে পরিশুদ্ধ না করলে অন্তরের ইবাদত এবং আত্মিক জ্ঞান গ্রহণযোগ্য হবে না।”

ইমাম আশ-শাফি বলেন, “আমি চাই আমার জ্ঞান থেকে সবাই উপকৃত হোক কিন্তু একটি অক্ষরের জন্যও আমাকে প্রশংসা করা হোক তা চাই না।”

ইমাম আবুল হাসান আল-মাওয়রিদী তাঁর জীবদ্দশায় একটি গ্রন্থ (আল-হাওয়ি, ১৮ খন্ড) রচনা করেছিলেন। তিনি ছাড়া তাঁর রচিত গ্রন্থের কথা কেউ জানত না। যখন তাঁর মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হল, সে তার একজন বিশ্বস্ত ছাত্রকে ডেকে বললেন, “আমি এই বইটি লিখেছি। আমি এটি প্রকাশ করিনি কারণ আমি আমার ইখলাসের ব্যাপারে ভীত ছিলাম। তাই বলছি যখন আমার মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হবে আমার হাতের ওপর তোমার হাত রাখবে। যদি দেখো আমি তোমার হাত শক্ত করে ধরছি তাহলে বুঝে নিবে আমার নিয়ত খালেস ছিল না; তখন আমার বইগুলো নদীতে ফেলে দিয়ে আসবে। আর যদি দেখো আমি তোমার হাত হালকাভাবে ধরছি তাহলে বুঝে নিবে আমার নিয়ত একনিষ্ঠ ছিল। তখন এগুলো প্রকাশ করবে।”

অবশেষে যখন মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হলো ছাত্রটি তাঁর কবজি ধরল। কিন্তু তাঁর মুষ্টি হালকা হয়ে এলো। ফলে তার বইসমূহ প্রকাশিত হল এবং ছড়িয়ে পড়ল।

কুরআন তিলাওয়াত

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেন,

যে ব্যক্তি উচ্চস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করে তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যে প্রকাশ্যে দান করে। আর ব্যক্তি নিচুস্বরে কুরআন তিলাওয়াত করে তার দৃষ্টান্ত ঐ ব্যক্তির মত যে গোপনে দান করে।

জনৈক ব্যাক্তি ইব্রাহীম আননাখায়ীর কাছে আসলেন। তিনি তখন কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। লোকটিকে দেখে তিনি মুসহাফ (কুরআন) ঢেকে রাখলেন।

রোজা

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনা উল্লেখ আছে ইবনে আলীর বর্ণিত আযযাহাবীর সিয়ারে। দাউদ ইবনে আবূ হিন্দ (রহঃ) পরিবারকে না জানিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর যাবত নফল রোজা রেখেছিলেন। বাসা থেকে তার জন্য তৈরী খাবার নিয়ে তিনি রাস্তার গরীব লোকদেরকে দিয়ে দিতেন। ফলে তার স্ত্রী এবং লোকেরা ভাবত তিনি খাবার খেয়েছেন।

আমর বিন কায়স ২০ বছর যাবত তার পরিবারকে না জানিয়ে রোযা রেখেছিলেন।

অনেকেই তাদের রোজা রাখার বিষয়টি গোপন রাখতে তাদের ঠোঁটে তেল/চর্বি পর্যন্ত মেখে রাখতেন।

গোপনে দান

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন,

তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান কর তবে তা উত্তম কিন্তু যদি গোপনে দান কর এবং অভাবগ্রস্তকে দাও তবে তা তোমাদের জন্য আরও উত্তম। আল্লাহতা’আলা তোমাদের কিছু গোনাহ দূর করে দিবেন। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্মের  খবর রাখেন। যারা স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে রাত্রে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে। তাদের জন্যে তাদের সওয়াব রয়েছে তাদের পালনকর্তার কাছে। তাদের কোন আশংঙ্কা নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।

এ আয়াতে আল্লাহ্‌ প্রকাশ্য দানের পূর্বে গোপনে দানের কথা বলেছেন। দিনের পূর্বে রাত্রিতে দানের কথা উল্লেখ করেছেন। আলওয়াহিদী বলেন, এ আয়াতটি আলী (রাঃ)এর উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছিল। আলী (রাঃ) কাছে ৪০০০দিরহাম ছিল যা তিনি গোপনে, প্রকাশ্যে, দিনে এবং রাতে ব্যয় করেন।

আলী বিন হুসাইন (রহঃ) প্রতি রাতে মদীনার গরিব লোকদেরকে খাবার সরবরাহ করতেন। কিন্তু কেউই জানত না কে তাদের খাবার দিচ্ছে। তিনি মারা যাওয়ার পর একশ পরিবারের খাবার দেওয়া হঠাৎ/আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেল। তখন সবাই বুঝতে পারল যে এটা আলী বিন হুসাইন (রহঃ) এর কাজ। আলী বিন হুসাইন (রহঃ) এর মৃত্যুর পর তার পিঠে বোঝা বহনের চিহ্ন পাওয়া যায়।

বিশর ইবন আল-হারিস বলেন, “হজ্জ, উমরা এবং জিহাদ অপেক্ষা সদাকা করা উত্তম। কারণ লোকেরা এই আমলগুলো দেখতে পায়। কিন্তু গোপনে দান করলে আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কেউ দেখতে পায় না ।”

কান্না

যাইদা বলেন, মানসুর ইবনে  আল-মুতামির দীর্ঘ ৬০বছর ধরে রাতে নামাজ পড়তেন, দিনের বেলায় রোজা রাখতেন এবং প্রচুর কান্নাকাটি করতেন। তার মা তাকে বললেন, “হে আমার পুত্র, তুমি কেন এভাবে নিজেকে ধ্বংস করছ?” তিনি প্রতি উত্তরে বললেন, “আমি নিজের সাথে যা করছি তা খুব ভালভাবেই জানি।” যখন সকাল ঘনিয়ে আসত তিনি কান্না লুকানোর জন্য চোখে সুরমা পড়তেন, মাথায় তেল দিতেন, রোজার ক্লান্তি লুকানোর জন্য ঠোঁট চকচকে করে নিতেন এবং এভাবে লোকদের কাছে যেতেন।

মুহাম্মদ ইবনে আল-ওয়াসি বলেন, “আমি এমন লোকের দেখা পেয়েছি যে একই বালিশে মাথা রেখে স্বামী-স্ত্রী শুয়ে আছে, স্বামীর চোখের পানিতে তার গন্ডদেশের নিচের বালিশ ভিজে গেছে অথচ স্ত্রী তার খবরই পায়নি। আবার অনেক লোক জামাতের কাতারে দাঁড়িয়ে চোখের পানিতে গাল ভিজিয়ে ফেলছে অথচ তার পাশে দাঁড়ানো লোকটি তা অনুভবই করতে পারেনি।”

কিছু লোক তাদের কান্না এমনভাবে লুকাতো যদি অপ্রত্যাশিতভাবে কোন লোক তাদের কাছে এসে পড়তো তখন কান্না গোপন করতে গিয়ে সর্দির কথা প্রকাশ করতো। আর যদি রোধ করতে না পারত তাহলে সেখান থেকে উঠে চলে যেত।

ইবনে সিরিন দিনের বেলা লোকেদের সাথে কথা বলতেন, হাসতেন কিন্তু রাত হলেই এমন ভাবে কাঁদতেন যেন পুরো গ্রাম তিনি ধ্বংস করেছেন।

মুয়াবিয়াহ বিন কুররা বলেন,“ চোখের অশ্রু অপেক্ষা অন্তরের কান্না অধিক উত্তম।”

অন্যকে সাহায্য করা

একজন ব্যাক্তির শুধুই এমন আমল করা উচিৎ নয় যার দ্বারা শুধুমাত্র সে নিজেই উপকৃত হয়। যেমন- নামাজ, রোজার মত ইবাদত। অবশ্যই অপরের কল্যাণ সাধনে কাজ করা উচিৎ। এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ একটি ঘটনা বর্ণিত আছে। উমর (রাঃ) একজন বৃদ্ধ অন্ধ মহিলার দেখাশোনা করতেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি খুব ভোরে তার বাড়ির দিকে রওনা হলেন। অবাক হয়ে দেখলেন কেউ একজন তাঁর পৌছানোর আগেই বৃদ্ধ মহিলাটির প্রয়োজন পূরণ করে ফেলেছে। লোকটি কে হতে পারে জানার জন্য তিনি অপেক্ষা করলেন। তিনি আবিস্কার করলেন লোকটি আর কেউ নন স্বয়ং আবুবকর (রাঃ)। তিনি ছিলেন তৎকালীন সময়ের খলিফা। উমর (রঃ) অবাক হয়ে বললেন, “আমি কসম করে বলছি, আমার ধারণা ছিল এটি কেবল আপনিই হতে পারেন।”

এ কারণেই আবু বকর (রাঃ) এবং উমার (রাঃ )ছিলেন এত অসাধারণ। তারা ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সৃষ্টির সর্বোত্তম শিষ্য। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের দুজনের সম্পর্কে বলেন,

তারা হল আমার শ্রবণ এবং দৃষ্টি।

গোপনে দু’আ করা

মুহাম্মদ বিন মুন কাদির বলেন, প্রচন্ড খরার সময় জনসাধারণের মধ্যে এক লোককে সালাতুল ইস্তিস্কা (বৃষ্টির জন্য সালাত) পড়তে দেখেছি। লোকটি বলছিল, “হে মাবুদ! লোকেরা তোমার রাসূলের নির্দেশ বারংবার অমান্য করা সত্ত্বেও তোমার দরবারে বৃষ্টির জন্য দুয়া করছে, কিন্তু তুমি তাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করোনি। মাবুদ! আমি তোমার কাছে মিনতি সহকারে আবেদন করছি তুমি তাদের প্রার্থনা কবুল করো। ইবনে মুন কাদির লক্ষ করলেন লোকটির প্রার্থনা শেষ হল, বৃষ্টিও শুরু হলো। তিনি লোকটিকে বলতে শুনলেন, ‘মাবুদ! কে আমি আর কি এমন আমল করেছি যে তুমি আমার দুয়া কবুল করলে? মাবুদ! আমি তোমার মর্যাদা এবং শক্তির কাছে আত্মসমর্পন করলাম।” লোকটিকে আরও ভালোভাবে জানার জন্য ইবনে মুন কাদির তাকে অনুসরণ করলেন। সে ছিল অতি সাধারণ একজন মুচি। এক সময় তিনি অজ্ঞাতনামা মুচি লোকটির মুখোমুখি হলেন। সে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ইবনে মুন কাদির বুঝতে পারলেন, এই লোকটির দু’আ কবু্ল হয়েছিল। লোকটি হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। তারপর থেকে এই শহরে আর কখনোই তার দেখা মেলেনি।

অপরিচিত থাকা

সুফিয়ান আসসাওরি বলেন, “তোমাদের প্রতি আমার উপদেশ অপরিচিত থাকো, যেহেতু সময়টাই অপরিচিত হয়ে থাকার ।” এই উপদেশ কাজে লাগিয়ে জীবন অতিবাহিত করুন। অনেকেই শায়খের এই বক্তব্যকে উল্টো বুঝতে পারেন। কেননা অপরিচিত থাকা স্বত্বেও ইমাম আসসাওরী এবং অন্যান্য আলেমগণের নাম এখানে উল্লেখিত হয়েছে। এটা কখনোই তাদের প্রকাশ্যে দাওয়াতের কাজ করা, উৎপাদনমূলক কাজ এবং দাওয়াতের বিভিন্ন মুখী কাজে জড়িত থাকার সাথে সাংঘর্ষিক নয়। সম্ভবত মৃত্যুর পরের জনপ্রিয়তাই তাদের আন্তরিকতার সাক্ষ্য বহন করে। আমাদের কমপক্ষে একটা আমল সংরক্ষণ করা উচিৎ যা আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কেউ জানবে না কারণ আমরা এমন সময় পার করছি যখন কিনা অন্যরা কি করছে তা জানা খুব একটা কঠিন না। একজন আরবীয় ব্যাক্তির উক্তি “আপনার সম্পদ এমন স্থানে লুকিয়ে রাখুন যেখান থেকে হারানোর কোন ভয় নেই।”


উৎস: ইসলাম ২১c (মূল আর্টিকেল লিঙ্ক) 

অনুবাদক: তানজিলা শারমিন

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

Updated: May 15, 2019 — 5:11 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *