রমাদান শেষ হলেও আশা থেকে যায়

রমাদান মাস শেষ হয়ে গেল। সাহরি, ইফতারের পবিত্র সেই আমেজ, মধুবর্ষী কুরআন তিলাওয়াত, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিতর বা তাহাজ্জুদ পড়ার সেই আকুলতা এগুলো সবই হয়তো বাহ্যিকভাবে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছে। রমাদান চলে গেছে সত্য, তবুও এর রেশ তো আমাদের মনে নিশ্চয়ই রয়ে গেছে। এই রমাদানের পরশে আমরা কেউ হয়তো হয়েছি আরও শুদ্ধ, আরও পরিপূর্ণ;  আবার কারও কারও অন্তরে বইছে হতাশার সুর।

হতাশা?

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন! অস্বীকার করার উপায় নেই যে, রমাদানের পর আমাদের কেউ কেউ ভুগছে মানসিক দীনতায়। আমার এই লেখাটা তাদের জন্যই, যারা পবিত্র রমাদান মাস চলে যাওয়ায় বেদনার্ত হয়ে পড়েছেন। যদি এমন হয় যে, আপনি রমাদানকে কাজে লাগাতে পারেননি; এখন উপায় খুঁজছেন কী করা যায়, তাহলে বলব আপনি ঠিক জায়গাতেই এসে  পৌঁছেছেন। আপনাকে আশার আলো দেখাতে চাই আমি।

সবকিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে-এমন ভাবনা নিয়ে আমরা অনেকেই আমাদের ক্ষুণ্ণ হৃদয়কে পাশ কাটিয়ে যাই। হতেই পারে আপনি রমাদানকে ঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। হয়তো আপনি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু অন্যদের মতো সফল হতে পারেননি। আবার এমন হওয়াও স্বাভাবিক যে, আপনি জটিল কোনো রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাই আমল করার অনেক পথই রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল আপনার। এসব বাস্তবতাকে তো আর মাটি চাপা দেওয়া যায় না, বরং এদেরকে মেনে নিয়েই সামনে এগুতে হবে।

প্রথমত ভেবে দেখুন, আপনিতো সেইসব হাজার হাজার লোকের ভীড়ে পড়েননি যারা গত রমাদানে পরপারে পাড়ি দিয়েছেন।   নিশ্চয়ই এই মহান মাসের পরও আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার পেছনে আল্লাহর কোনো পরিকল্পনা আছে। ‘আপনি রমাদানকে ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারেননি’ দেখেই যদি আল্লাহ আপনাকে বাতিলের খাতায় ফেলে দিতেন, তাহলে আপনাকে মৃত্যুর হাতে অর্পণ করতে পারতেন তিনি বহু আগেই। কিন্তু না, তিনি আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বেছে নিয়েছেন। আপনাকে তিনি আরেকটি সুযোগ দিচ্ছেন তাঁর অসীম দয়ার ফলেই তো! জেনে রাখুন, আল্লাহ আপনাকে এখনও ভালোবাসেন। আপনি নিজের ওপর থেকে বিশ্বাস হারাতে পারেন, কিন্তু আল্লাহতা’আলা আপনাকে এখনও বিশ্বাস করেন। কৃতজ্ঞ হোন, কারণ অসীম করুণাময় পথ প্রদর্শনের দরজাগুলো এখনও খোলা রেখেছেন আপনার জন্য। সুতরাং উঠে দাঁড়ান। সেসব দরজার পথ ধরে হাঁটা শুরু করুন এখনই। দেরি করবেন না যেন! নিজের আত্মাকে ভরসার নিম্নোক্ত কিছু বারি বিন্দুতে পূর্ণ করুন।

মনে রাখবেন রমাদানই শেষ সুযোগ নয়

সন্দেহ নেই যে, যারা নিজেদেরকে বদলাতে চান তাদের জন্য রমাদানই সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে আসে। কিন্তু এর মানে এই নয়, এটাই শেষ সুযোগ। এই পবিত্র মাসে অনেকেই আল্লাহর পথে ফিরে আসেন কেউ আবার তারও পরে ফেরেন। শেষের বদলটি নিজেদের অপরাধবোধকে ইতিবাচক প্রেরণায় রূপান্তরিত করে নেন।

বলুন,“হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরাহ যুমার(৩৯): ৫৩]

অন্তরকে পোড়ান অনুতাপের দহনে, আল্লাহর দরবারে কেঁদে বুক ভাসান, মর্ম পীড়ার এই যন্ত্রণার টানে নিজেকে নিয়ে যান আপনার প্রভুর আরও কাছে। আল্লাহ সুবহানুওয়াতা‘আলা আপনাকে তাঁর অসীম ক্ষমা আর দয়ার পানে ডেকে যাচ্ছেন। এতে সাড়া দিন ।

সময় ফুরোবার আগেই তওবা করুন

নিজেকে বদলাতে হবে, এটা বুঝেছেন। কিন্তু এ যে যথেষ্ট না! এখনো অন্তরে বিশুদ্ধতা নিয়ে আসা বাকি।

আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ কর। তোমাদের কাছে শাস্তি আসার আগে; তারপরে তোমাদেরকে সাহায্য করা হবে না। [সূরাহ যুমার(৩৯): ৫৪]

জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করুন

সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার এখনই নিয়ে ফেলুন। এবং ঠিক এই মুহূর্ত থেকে যা-ই করবেন, সর্বোচ্চ চেষ্টা রাখবেন সেটাকে যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কাজে লাগাতে পারেন। রমাদানে যদি লক্ষ্য অনুযায়ী তাকওয়াবান (আল্লাহ ভীরু) হতে নাও পারেন, খুব বেশি চিন্তিত হবেন না। সামান্য পরিশ্রম করেই তা অর্জন করে নেওয়ার সুযোগ এখনও আপনার আছে।

তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদা সম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহ ভীরু। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সব কিছুর খবর রাখেন। [সূরাহ হুজুরাত(৪৯) :১৩]

আল্লাহ ভীরু হচ্ছেন তিনিই, যিনি আল্লাহর নিষেধগুলো থেকে বেঁচে থাকেন আর শুধু আল্লাহকেই খুশি করার জন্য যাবতীয় ভালো কাজগুলো করেন। এখন আপনি এটা কীভাবে করতে পারেন তা দেখা যাক।

  • কোন কোন পাপ আপনার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, তাদের একটি তালিকা তৈরি করে নিন। এরপরে কোমর বেঁধে নেমে পড়ুন জীবন থেকে সেগুলোকে ঝেড়ে ফেলতে।
  • খুঁজে খুঁজে বের করুন কোন জিনিসগুলো আপনকে পাপের দিকে টেনে নিয়ে যায়। ব্যস, এবার সেসব থেকে দূরে থাকলেই হলো।
  • আর যত বার শয়তান চাইবে আপনকে আবার সেদিকে নিয়ে যেতে তত বারই নিজেকে মনে করিয়ে দেবেন আপনি একটি মিশনে নেমেছেন। যাতে হেরে গেলে একদমই চলবে না। তাই নিজের প্রত্যয়ের ব্যাপারে স্বচ্ছ থাকুন।
  • প্র্যাকটিস মেইকস আ ম্যান পারফেক্ট। যত বেশি চেষ্টা করে যাবেন তত সাফল্যের দিকে এগুতে থাকবেন। মনের পাপ কাজ করার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এভাবেই সেসব চিন্তাকে লাথি মেরে ভাগানোর জন্য প্রস্তুত করে অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে তুলুন।
  • কিছু সহজ নেক কাজ বাছাই করুন। এমন সব কাজ যেগুলো আপনি নিয়মিত করতে পারবেন এবং এরপর কাজগুলো করা শুরু করে দিন।
  • কাফিররাও তো ভালো কাজ করে। কারণ সাধারণত এসব কাজ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে থাকে। কিন্তু একটা ভালো কাজ নিয়মিত করা, আর না করাতেই তাদের সাথে ঈমানদারের পার্থক্য।

আয়িশা (রা.)থেকে বর্ণিত: আল্লাহর রাসূল(ﷺ)বলেছেন,

তোমরা ঠিকভাবে নিষ্ঠাসহ কাজ করে নৈকট্য লাভ কর। জেনে রেখ, তোমাদের কাউকে তার আমাল জান্নাতে প্রবেশ করাবে না এবং আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো, যা সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয় যদিও তা অল্প হয়।[৬৪৬৭; মুসলিম৫০/১৭, হাঃ২৮১৮,আহমাদ ২৪৯৯৫]

নিষ্ঠার সাথে করলে ছোট আমলও গুরুত্ব পায়

সুতরাং ছোট ছোট পদক্ষেপ ফেলা শুরু করুন এবং ধীরে ধীরে এগিয়ে যান বড় বড় লাফের দিকে। নিচে একটা তালিকার নমুনা দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু আপনি চাইলে নিজের সুযোগ সুবিধামতো এতে পরিবর্তন আনতে পারেন।

*যত যাই ঘটুক জীবনে, দিনে পাঁচবার সময়মত সালাত আদায় করুন। এটা করতেই হবে।

*চেষ্টা করবেন জামাতের সাথে সালাত আদায় করতে। অন্তত এক ওয়াক্তের সালাত নিয়মিতভাবে জামাতে আদায় করুন।

*অন্তত পাঁচটি আয়াত কুরআন থেকে তিলাওয়াত করুন প্রতিদিন। এবং তা অবশ্যই অর্থসহ।

*রাতে তাহাজ্জুদে দাঁড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন।

*সাধ্যানুসারে কিছু দান সাদাকাহ করুন। পারলে প্রতিদিন। কিংবা প্রতি সপ্তাহে বা মাসে।

*নফল সিয়াম পালন করুন। (সাপ্তাহিক-সোম ও বুধবার, মাসিক-আইয়ামে বীয অর্থাৎ চান্দ্র মাসের মাঝের দিন গুলোতে।)

*নির্ভরযোগ্য কোনো দ্বীনি হালাকায় যোগ দিন। এই হালাকা হতে পারে অফলাইনে। এমনকি অনলাইনের লেকচার থেকেও নিয়মিত উপকৃত হতে পারেন আপনি।

*উত্তম আখলাকের মানুষদের সাথে সুসম্পর্ক, বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন।

*সময়ের অপচয় থেকে বেঁচে থাকুন। প্রয়োজনে অযথা আড্ডা বা অনলাইন চ্যাট ছেড়ে দিন যত দ্রুত সম্ভব। আর মুভি দেখা, গান শোনা তো একেবারে ছাড়তে হবে।

আবারও বলছি, আপনার লিস্টের প্রতিটি কাজই কিন্তু করতে হবে নিয়মিত। গ্যাপ দেওয়া চলবে না। তবে কখনও যদি কোনওটা মিস হয়েই যায়, তো চেষ্টা করবেন সেটা তৎক্ষণাৎ পুষিয়ে দেওয়ার।

সবশেষে এবং গুরুত্বের সাথে যেটা বলতে চাই তা হলো উপর্যুক্ত কাজগুলো করার সময় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হোন এ ব্যাপারে যে,  আপনি আসলে নিজেকে পরের রমাদানের জন্য প্রস্তুত করছেন!

ঊমার ইবনুল খাত্তাব(রা)বলেন,

আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু‘আলাইহিওয়াসাল্লাম)কে বলতে শুনেছি, কাজ এর প্রাপ্য হবে নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে-তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে, যে জন্যে সে হিজরত করেছে।” (মুসলিম২৩/৪৫হাঃ১৯০৭,আহমাদ১৬৮)(আধুনিকপ্রকাশনী-১,ইসলামিকফাউন্ডেশন১)

যদিও উপরের হাদীসটি হিজরতের ঘটনার প্রেক্ষিতে বর্ণিত, তবুও আলিমরা একে জীবনের যে কোনো কাজের ক্ষেত্রে, যে কোনো নিয়তের বেলায় প্রযোজ্য বলে মত দিয়েছেন। সুতরাং এখনই দৃপ্ত নিয়ত করে ফেলুন যে, পরবর্তী রমাদানের আগেই আপনি নিজেকে প্রস্তুত করে নেবেন।

শুরুতে যেমনটা বলছিলাম, ব্যর্থতার যাতনাকে সাফল্যের পাথেয় হিসেবে পরিণত হতে দিন। নিজের কাছেই ওয়াদা করুন যে, আপনি অবশ্যই নিজেকে উন্নত করার কাজ চালিয়ে যাবেন সাফল্য পাওয়ার আগ পর্যন্ত। আগামী রমাদানকেই নিজের জন্য পারফেক্ট একটা রমাদান বানিয়ে ছাড়বেন, ইনশাআল্লাহ। আর এরই মাঝে যদি আপনার মৃত্যুও এসে যায় এমনকি তা রমাদান শুরুর আগেই তবুও নিয়ত এবং চেষ্টার কারণে আপনি আল্লাহর তরফ থেকে যথাযথ পুরষ্কারই পাবেন।

আল্লাহ আমাদের সরল পথে অবিচল থাকার তৌফিক দিন। আমাদের গোনাহ এবং ভুলগুলো ক্ষমা করুন। আমিন।


উৎস: ইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি ব্লগ (মূল আর্টিকেল লিংক)

অনুবাদক: মাহমুদ বিন আমান

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

Updated: June 4, 2019 — 6:03 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *