রমাদানে টাইম ম্যানেজমেন্ট

দোরগোড়ায় এসে গেছে বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ মাস ‘রমাদান’! নিশ্চয়ই এরই মাঝে আপনাদের অনেকেই ইফতার সামগ্রী কেনা ও মজুদ করা শুরু করে দিয়েছেন। রমাদানের প্রস্তুতির জন্যে যত বেশি সম্ভব জিনিসপত্র ডাউনলোড করা শুরু করেছেন। কিন্তু এই প্রশ্নটা থেকেই যায়, “কিভাবে আমি আমার সময়গুলোকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি যেন আমি সবগুলো কাজ ঠিকঠাকভাবে করতে পারি ?”

ঠিক এই বিষয়েই আপনাকে সাহায্য করবে এই আর্টিকেলটি ইনশা আল্লাহ্‌। আর কোন সময়ক্ষেপণ না করে চলুন সরাসরি চলে যাই আমাদের রমাদানের টাইম ম্যানেজমেন্ট কৌশলগুলোতে:

 আগে থেকেই প্ল্যান করুন

টাইম ম্যানেজমেন্ট বিষয়টা প্ল্যানিং (পরিকল্পনা) এবং  অ্যাপ্লিকেশন (প্রয়োগ) এই দুয়ের মাঝে বিভক্ত। ঠিকঠাক পরিকল্পনা ছাড়া প্রয়োগ করবার মত বেশি কিছু আসলে থাকে না। আর ফলাফলটা হয় যে আরেকটা রমাদান এমনি এমনি শেষ হয়ে যায়। রমাদানের জন্য প্ল্যান বানাতে হলে আমাদের প্রয়োজন রমাদানের উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া। আর তা হল তাকওয়া অর্জন। সুতরাং রমাদানে আমাদের লক্ষ্য হওয়া চাই হিদায়াত এবং তাকওয়ায় নিজেদেরকে আরও উন্নীত করা।

ইবাদত করবার জন্য আপনি প্রতিদিন সর্বোচ্চ কতটুকু সময় ব্যয় করতে পারবেন হিসেব করুন

আমরা সবাই আশা করি যে পুরো রমাদান জুড়ে আমরা দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই ইবাদতে ব্যয় করব। কিন্তু এটা বাস্তবসম্মত না, তাছাড়া আমাদের প্রায় সবারই অন্যান্য কিছু দায়িত্ব রয়েছে যেগুলো আমাদের পালন করতে হয়। কাজেই আগে থেকে বের করে ফেলুন ইবাদতের জন্য প্রতিদিন কত বেশি সময় আপনি হাতে রাখতে পারবেন। তারপর সেই পরিমাণ ইবাদত করবার উদ্দেশ্যে লক্ষ্যস্থির করুন। ফর্মুলাটা সহজ:  ২৪ ঘণ্টা – (ঘুমের সময়, কাজের সময়, পরিবারের কর্মব্যস্ততা) = ইবাদতের সময়

উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি ৩ ঘণ্টা ইবাদতের সময় রাখেন, তাহলে এক ঘণ্টা কুরআন তিলাওয়াতের জন্যে, এক ঘণ্টা ইসলাম নিয়ে পড়াশোনায় এবং এক ঘণ্টা দুয়া ও যিকিরের জন্যে নির্ধারণ করুন। যদি আপনি এই ফর্মুলা মেনে চলতে পারেন, তাহলে পুরো মাস জুড়ে আপনি সত্যিই অনেক পরিমাণ অর্জন করে ফেলতে পারবেন।

সুস্পষ্টভাবে লক্ষ্যস্থির করুন

আপনি এখন জানেন ইবাদতের জন্য প্রতিদিন কতটুকু সময় আপনি পাচ্ছেন, এরপরের ধাপটি হচ্ছে লক্ষ্যটাকে S.M.A.R.T বানানো। S.M.A.R.T মানে হচ্ছে আপনার লক্ষ্যটা হবে specific বা সুনির্দিষ্ট,  measurable বা পরিমাপযোগ্য,  attainable বা অর্জনসাধ্য,  realistic বা বাস্তবসম্মত এবং time-bound বা নির্দিষ্ট সময়ে বাঁধা। যেমন ধরুন, আপনার লক্ষ্য যদি হয় এই রমাদানে কিছু তাফসীর পড়া, সে ক্ষেত্রে সমস্যাটা হচ্ছে এই লক্ষ্যটা একেবারেই অস্পষ্ট (কোন তাফসীর), পরিমাপযোগ্য না (কয় পৃষ্ঠা পড়ব) এবং অর্জনসাধ্য বা বাস্তবিকও না (এই লক্ষ্যপূরণের জন্যে আমার কি এক পৃষ্ঠা তাফসীর পড়লে হবে নাকি ৫টা তাফসীরের বই পড়তে হবে)।

একটি S.M.A.R.T লক্ষ্য হবে, আমি এই রমাদানে ৮০০ পৃষ্ঠার এই তাফসীরের বইটি পড়ে শেষ করব। ২৯ দিনে ৮০০ পৃষ্ঠা পড়ে শেষ করতে হলে, আমাকে প্রতিদিন গড়ে ২৮ পৃষ্ঠা করে পড়তে হবে।

প্রতিটি লক্ষ্যের জন্যে সময় ভাগ করে নিন

রমাদানের জন্য এখন আপনার লক্ষ্যগুলো সুস্পষ্ট করা হয়ে গেছে এবং আপনি এটাও জানেন প্রতিদিন ইবাদতের জন্য আপনার কাছে কি পরিমাণ সময় রয়েছে। পরের ধাপটি হচ্ছে এই দুটোর মাঝে সমন্বয় করা; রোজকার প্রতিটি লক্ষ্যের জন্যে আলাদা আলাদা করে নির্দিষ্ট সময় ভাগ করে নিন। উদাহরণস্বরূপ, আপনার লক্ষ্য হচ্ছে প্রতিদিন ৩০ পৃষ্ঠা তাফসীর পড়া। এজন্যে যদি আপনার সময় লাগে এক ঘণ্টা এবং আপনি জানেন যে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তারাবীহর আগে আপনি এক ঘণ্টা ফ্রি সময় পান, তাহলে ওই সময়টাকে আপনি রেখে দিন তাফসীরের সময় হিসেবে। আলাদা করে করে দিনের একটা সময় নির্দিষ্ট করুন কুরআন তিলাওয়াতের জন্য (হতে পারে ফজরের আগে বা পরে), দুয়ার জন্য (ইফতারের পূর্বে), পরিবারকে নিয়ে হালাকার জন্য (আসরের পরে বা তারাবীহর পরে) এবং অন্য যে কোনো লক্ষ্যের জন্য যেটা আপনি অর্জন করতে চাইছেন।

ফজরের সময়টা কাজে লাগান

গ্রীষ্মপ্রধান দেশগুলোতে সুহুর হয় বেশ আগে আগে। ফলে অনেক মানুষই সুহুরের আগে আগে ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে, আমি পরামর্শ দেই সুহুরের পর এক ঘণ্টা ইবাদতের কাজে ব্যয় করার। শীতপ্রধান দেশগুলোতে আবার সুহুর হয় বেশ দেরিতে। কাজেই এর এক ঘণ্টা আগে উঠে যাওয়াটা এখানে সহজ। এমন দেশগুলোয় বসবাসরতদের জন্যে আমার পরামর্শ হবে এক ঘণ্টা আগে আগে উঠে যাওয়া এবং ওই সময়টা কিয়াম আল-লাইল (তাহাজ্জুদ), দুয়া এবং কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করা। ফজরের সময়টা হল বারাকাহপূর্ণ (বরকত) একটি সময়। আর এটা এমন একটি সময় যখন আমাদেরকে আমাদের কাজে কিংবা পরিবারের দায়িত্বপালনে ব্যস্ত থাকতে হয় না। এই সময়টা কাজে লাগান।

পরিবারকে নিয়ে হালাকায় বসবার একটি সময় ঠিক করে নিন

পরিবারের বাঁধন মজবুত করতে এবং সবাই একসাথে ঈমান বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত সময়ট হচ্ছে রমাদান। এসময় শয়তানেরা থাকে বাঁধা, আর সবাই এমনিতেই বেশি স্পিরিচুয়াল থাকে। স্পিরিচুয়ালিটির এই আবেশটাকে সযত্নে লালন করতে হবে যেন আমরা রমাদানের পরেও তা থেকে উপকৃত হতে পারি। এটা করবার একটা উপায় হচ্ছে পারিবারিক হালাকা আয়োজন করা (আলোচনা বা পড়বার মজলিস)। একটি ইসলামিক বই নিন, সেখান থেকে একটি অধ্যায় পড়ুন (বা একটি লেকচার শুনুন)। তারপর সবাই বসে তা নিয়ে আলোচনা করুন। এমনকি রমাদানের পরেও এটা জারি রাখুন।

প্রত্যহ কুরআনের জন্য সময় করে রাখুন

রমাদান হল কুরআনের মাস। তাই প্রতিদিনই কুরআনের জন্য অবশ্যই অবশ্যই সময় করে রাখতে হবে। কোথাও কোথাও দেখা যায় প্রতিবার রমাদান এলেই মানুষজন খুব তাড়াতাড়ি কুরআন তিলাওয়াত করা শুরু করে যেন এই দায়িত্বটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেরে ফেলা যায়। অথবা যেন যত বেশিবার সম্ভব খতম দেয়া যায়। এই কাজটি করবার পরিবর্তে সঠিকভাবে তিলাওয়াতের উপর ফোকাস করুন, মনোযোগ দিন। তাফসীর পড়ুন এবং সেই ভাবার্থের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করুন। এর প্রভাব ব্যক্তির ঈমান ও তাকওয়ার উপর পড়বে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে।

মাল্টি-টাস্কিং হতে বিরত থাকুন

একটি সাধারণ টাইম ম্যানেজমেন্ট কৌশল যা রমাদানের সময়টা ছাড়াও বাকি অন্যান্য সময়েও প্রযোজ্য। গবেষণায় দেখা গেছে মাল্টি-টাস্কিং আপনার প্রোডাক্টিভিটি কমিয়ে দেয়। এর ফলে সম্পাদিত কাজ হয় নিম্নমানের। আধুনিক কালের টাইম ম্যানেজমেন্টের এক্সপার্টরা এ ব্যাপারে একমত যে মাল্টি-টাস্কিংয়ের চেয়ে বরং কোন একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটিই কাজের ওপর ফোকাস করবার মাধ্যমে কাজটি আরও দ্রুত সম্পাদন করা যায় এবং কাজের মানও আরও ভালো হয়ে উঠে। কুরআন তিলাওয়াত করবার সময় একইসাথে ফেসবুক চালানো, সেইসাথে বাচ্চার দেখাশোনা করা- এসব একসাথে করার চেষ্টা করবেন না। তাফসীর পড়া বা দুয়া করবার বেলায়ও এই কথা প্রযোজ্য। এমন একটি স্থান, কাল ও পরিবেশ নির্বাচন করুন যখন আপনার মনোনিবেশ ক্ষুণ্ণ হবার সম্ভাবনা থাকবে খুবই কম এবং আপনার ইবাদতে আপনি দিতে পারবেন নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ।

অতিরিক্ত সামাজিকতা থেকে সংযত হোন

এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া এবং বাস্তব জীবনের সামাজিকতা-দুটোই পড়ছে। রমাদান হল ইতিকাফের মাস। ইতিকাফের উদ্দেশ্যগুলোর একটি হচ্ছে আমাদের সামাজিক জীবনের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে একটু অবকাশ নেয়া; ফলে আল্লাহ্‌র সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক রয়েছে তার উপরে আমরা যেন ফোকাস করতে পারি। আপনি যদি ইতিকাফ করতে না পারেন তবুও আপনি রমাদানে এই কল্যাণটুকু হাসিল করতে পারেন যে আপনি সামাজিকতার পিছনে ব্যয় করা সময়টা কমিয়ে আনলেন। আর ইবাদতে আরও বেশি সময় ব্যয় করলেন। ইফতার পার্টিতে যাওয়া যত সম্ভব কমিয়ে দিলেন, ফেসবুক বা টুইটারে আরো কম সময় ধরে লগইন করলেন এবং অপ্রয়োজনীয় আড্ডা, দেখাসাক্ষাৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারেন।

সুস্থ থাকুন

আপনি যদি অলসতা, দুর্বল বা বিচলিত অনুভব করেন অথবা আপনি যদি ঠিকমত না ঘুমান তাহলে কিন্তু আপনি আপনার লক্ষ্য পূরণ করতে পারবেন না। কেউ কেউ আছে যারা রমাদানের প্রথম দিনগুলোতে এতো বেশি করা শুরু করে যে শেষ পর্যন্ত রমাদানের অবশিষ্ট সময়টুকুতে অগ্রগতির জন্য আর কোন শক্তি বাকি রাখে না। ঠিকভাবে সময়ের সাথে তাল মেলান এবং যথেষ্ট ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাবারদাবার ও বেশি বেশি পানি পান করবার মাধ্যমে নিজের শরীরের যত্ন নিন।

সাধারণত একজন ব্যক্তির গড়ে ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন হয়। তাই এটা নিশ্চিত করুন যে আপনি ততটুকু ঘুম পাচ্ছেন। এমনকি এর জন্যে যদি আপনাকে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হয় তবুও। বেশি চিনিযুক্ত ও তৈলাক্ত খাদ্য এড়িয়ে চলুন। সুহুর ও ইফতার- দুটোতেই পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ করুন। রাত্রে ঘুমাবার আগে বেশি বেশি পানি পান করুন। এর ফলে দিনের বেলায় আপনার শরীরে পানির ঘাটতি থাকবে না।

আল্লাহ্‌ যেন এই রমাদানকে আমাদের সবার জন্য অনেক বরকতময় এবং প্রোডাক্টিভ করে দেন। আমীন।


উৎসইসলামিক অনলাইন ইউনিভার্সিটি ব্লগ (মূল আর্টিকেল লিঙ্ক ) 

অনুবাদক: রিয়াদুস সালেহীন, মুসলিম মিডিয়া প্রতিনিধি

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

Updated: May 4, 2019 — 7:59 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *