মনোযোগ বৃদ্ধিতে কুরআনের প্রভাব

শেষ কবে আপনি কোনো কিছুর ভেতর এমন তীব্র মশগুল ছিলেন যে, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যাওয়া সত্বেও আপনার সময়ের প্রতি কোন খেয়াল ছিল না? শেষ কবে আপনি একটা নির্দিষ্ট কাজ নিয়ে এক ধ্যানে ২৫ মিনিটেরও বেশী সময় ধরে মনোযোগী ছিলেন?

বর্তমান সময়ে এই পরস্পর সংযুক্ত বিশ্বের মাঝে কোনো কিছুর প্রতি একটানা মনোযোগ ধরে রাখার দক্ষতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু গবেষণা মতে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন গড়ে ১৫০ বার তাঁর মুঠোফোন চেক করে থাকেন। আপনি যদি কাজের সময়টুকু হিসেব করে এই সংখ্যাকে ভাগ দেন তাহলে দেখতে পাবেন এটি প্রতি ঘন্টায় প্রায় ১০ বার করে! আর তাই আমাদের মনোযোগ কিভাবে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে এ নিয়ে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

একজন সফল ব্যক্তিকে যদি আপনি সফলতার চাবিকাঠি কী জিজ্ঞেস করেন তাহলে তিনি উত্তরে বলবেন, কিছু দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য-পূরণ, স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য-পূরণ এবং প্রতিদিনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছাড়াছাড়া ভাবে না করে একাগ্রতার সাথে সম্পন্ন করার কথা। আমি শুধুমাত্র কাজের ভেতর মনোযোগী হওয়ার কথা বলছি না। আমাদের মনোযোগ দিতে হবে আধ্যাত্বিকতা, শারীরিক মঙ্গল এবং আমাদের পরিবার ও আশেপাশের সাথে সম্পর্কের দিকেও। আমাদের মনোযোগ যত বেশী বিক্ষিপ্ত এবং বিভক্ত হবে আমরা আমাদের জীবনের বিবিধ দায়িত্ব সর্বোত্তম ভাবে পালনে ততটা কম সফল হবো।

মনোযোগ কিভাবে আধ্যাত্বিকতার সাথে সম্পৃক্ত?

এই বিষয়ের উপর ক্যাল নিওপোর্ট’স তাঁর বই “Deep Work: Rules for focused success in a Distracted World” তে খুব ভাল লিখেছেন, যেখানে মনোযোগ বৃদ্ধি করার তাত্ত্বিক  এবং ব্যাবহারিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে একটি অধ্যায়ে তিনি একজন উচ্চপদস্থ পেশায় নিয়োজিত একজনের বাস্তব কাহিনী বর্ননা করেছেন, যিনি একজন প্রগতিশীল ইহুদী। তিনি প্রত্যহ সকালে তালমুদ পাঠ করতেন যা তার মনোযোগ এবং কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। একইভাবে যদি ফজর এর সালাত এর পরপর  কুরআন মুখস্থ করা এবং সেটিকে নিয়ে চিন্তা করা হয় তবে তা মুসলিমদের মনোযোগ বাড়াতেও সহায়তা করবে; যা আমাদের সফল হবার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফজর এর সালাত শেষ হবার পরেও আরও ৩০-৪৫ মিনিট ধরে বসে থাকা এবং তখন কুরআন তিলাওয়াত অথবা মুখস্থ করা নিজেকে বাইরের বিক্ষিপ্ততা ও প্রতিদিনের কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার একটি উত্তম পন্থা। কারণ স্রষ্টা প্রদত্ত গ্রন্থে তীব্র মনোযোগ প্রদান একজন ব্যক্তিকে বারবার নিজের মুঠোফোন চেক করার প্রলোভন থেকে বাঁচিয়ে রাখে অথবা এমন কিছু করা থেকে বিরত রাখে যা আপনার মস্তিস্কে প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়। এর দীর্ঘমেয়াদী ফলাফল হচ্ছে আপনি অনেক সংকটপূর্ণ কোন দীর্ঘ কাজ অথবা জটিল কোন সমাধান করতে সক্ষম হয়ে যাবেন।

আপনার ফোকাস পেশী এর জন্য কিছু পদ্ধতি

কিভাবে আপনি প্রতিদিন সকালে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন যাতে করে আপনি তীব্রভাবে কোন কিছুতে মনোযোগী হতে পারেন?

আন্তরিক হোন

আপনি নিছক আপনার ফোকাস পেশীকে ব্যায়ামের জন্য এই কুরআন মুখস্থ অথবা অধ্যয়ন করছেন না। আপনি আল্লাহ্‌ সুবাহানু ওয়া তা’আলার প্রতি ভক্তির জন্যই এই কাজ করছেন। এই ভাবনাই আপনাকে দীর্ঘমেয়াদীভাবে এর উপর অটল থাকতে সাহায্য করবে।

একটি নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন

এর জন্য সব থেকে উপযুক্ত সময় হচ্ছে ফজরের পরের সময়টুকু। লক্ষ্যস্থির করুন কমপক্ষে ৩০-৪৫ মিনিট যাবত এই কুরআন মুখস্থ করা অথবা এটি নিয়ে চিন্তা করার।

আপনার আশেপাশে মনকে বিক্ষিপ্ত করার মত কিছু রাখবেন না

মুঠোফোনকে দূরে সরিয়ে রাখুন। এটি আপনার পকেটে অথবা আপনার নাগালের ভেতর রাখবেন না।

আপনার চিন্তাশক্তি নিয়ন্ত্রণ করুন

যদি আপনার মন পড়ার সময় এদিক-ওদিক সরে যায় তাহলে পুনরায় আপনার মনকে কুরআনের দিকে ফিরিয়ে আনুন। যদি এমন কোন চিন্তা ঘুরপাক খায় যা সরাতে পারছেন না তাহলে নিজের কাছে খাতা, কলম রেখে লিখে রাখুন, পড়া শেষ হবার পর যেন আপনি সেই কাজ করতে পারেন।

অধ্যয়নকালে আপনার কল্পনাশক্তি এবং চিন্তাশক্তি কাজে লাগান 

যখন কুরআন তিলাওয়াত অথবা মুখস্থ করবেন আপনার সবকিছুকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে চেষ্টা করুন। এর লেখাগুলোকে পড়ার জন্য আপনার চোখকে কাজে লাগান, অডিও শোনার জন্য এবং সাথে সাথে বলার জন্য আপনার কন্ঠকে কাজে লাগান এবং কুরআন তিলাওয়াতের সময় হাতে স্পর্শ করুন (স্মার্টফোনে কুরআনিক এপ্স ব্যবহারের পরিবর্তে)। যখন আপনি তিলাওয়াত করছেন তখন আপনার কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগান যেন আপনি এর অর্থ, ছবি, সেই ঘটনাগুলো অনুভব করতে পারেন। এটি আপনার মস্তিষ্ক থেকে অনেক কিছু বের করে দেবে।

যদি আপনি সত্যিকার অর্থেই একটি অর্থবহ, উর্বর জীবনযাপন আকাঙ্খা করে থাকেন, যদি টুকরো অথবা বিক্ষিপ্ত জীবন কামনা না করে থাকেন, তাহলে আপনার ফোকাস পেশীর উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর এজন্য আপনার রবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণী সকাল বেলা এক ঘন্টা তিলাওয়াত করার মতো শক্তিশালী এবং বরকতময় আর কোন পদ্ধতি হতে পারে না।


উৎস: প্রোডাকটিভ মুসলিম ব্লগ (মূল আর্টিকেল লিঙ্ক)

অনুবাদক: আক্তার জাহান ফেরদৌস

অনুবাদ কপিরাইট © মুসলিম মিডিয়া

Updated: April 16, 2019 — 12:50 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *