বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মের ‘সত্যতা’ বা ‘অসারতা’ কোনোটাই সাব্যস্ত করা যায় না

Numbers on cookies

১৯৭৬ সালে ফরাসি চিকিৎসক মরিস বুকাইলির লেখা “La Bible, le Coran et la Science: Les Écritures Saintes examinées à la lumière des connaissances modernes” বইটি প্রকাশিত হয়, যেখানে কুরআনের শত শত আয়াত যে আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আলোচিত এই গ্রন্থ অনুযায়ী, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের তুলনায় মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কুরআন বিজ্ঞানের অধিকতর নিকটবর্তী।

শিল্প বিপ্লবের পর থেকে সারা দুনিয়ায় শুরু হয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়জয়কার। বিজ্ঞানমনষ্কদের মধ্যে অনেকে ধর্মকে বিজ্ঞানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধবিশ্বাস বলে জোরেশোরে প্রচার চালিয়ে যেতে থাকেন। বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে চলা পাশ্চাত্যের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত বড় বড় জ্ঞানীদের এরূপ প্রচারের ডামাডোলে অনেক বিশ্বাসীর বিশ্বাসের ভিত নড়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে মরিস বুকাইলির লেখা বইটি বিশ্বাসের ভিত নড়ে যাওয়া মুসলিমদের জন্য আশার আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভুত হয়। দেশে দেশে মুসলিমদের মধ্যে বইটি সমাদৃত হতে শুরু করে। অনেকগুলো ভাষায় তা অনুদিত হয়। বাংলা ভাষায় বইটি অনুদিত হয় “বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান” নামে।

ধীরে ধীরে বিজ্ঞানমনষ্ক কিন্তু বিশ্বাসী মুসলিমদের মধ্যে ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ (scientific miracles of the Quran) জ্ঞানের একটি ধারা হিসেবে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ১৯৮০-৯০ এর দশকে বিজ্ঞানী ড. এম. শমশের আলী জ্ঞানের এই ধারাটিকে বাংলাদেশে জনপ্রিয় করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ভারতীয় ধর্ম প্রচারক জাকির নায়েক বিষয়টিকে আরও অধিক সংখ্যক মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলেন।

তবে …

কোনো প্রকার পক্ষপাতদুষ্টতাকে দূরে সরিয়ে রেখে ইসলাম ধর্মের ধর্মগ্রন্থ কুরআনকে বিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে দাবী করা হচ্ছে নাকি আগে থেকে থাকা পক্ষপাত লেখক বা বক্তার উপসংহারকে প্রভাবিত করছে তা পক্ষপাতদুষ্টভাবে বিবেচনার দাবী রাখে। নিচের দুটি উদাহরণ বিষয়টিকে বুঝতে সাহায্য করবে।

. এই বিশ্বজগতের উৎপত্তি কীভাবে হলো তার একটি ব্যাখ্যা হিসেবে বিগ ব্যাং তত্ত্বটি বিজ্ঞানের জগতে বেশ জনপ্রিয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রাচীনতম একটি বিন্দুর অতি শক্তিশালী বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাবিশ্বের সৃষ্টি হয় এবং তখন থেকে নিয়ে ছায়াপথসমূহ পরস্পর দূরে সরে যাচ্ছে। কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে এই তত্ত্বকে সমর্থন করে বলে প্রতীয়মান হয়। ফলে, ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ ধারণাটির প্রস্তাবক ও প্রচারকেরা কুরআনের সত্যতা ‘প্রমাণে’ বিগ ব্যাং তত্ত্বটিকে লুফে নিয়েছেন।

. প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বকে (theory of natural selection) আধুনিক জীববিজ্ঞানের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ বললে মনে হয় অত্যুক্তি করা হবে না। কিন্তু, এই তত্ত্বটিকে আপাতদৃষ্টিতে কুরআনে বর্ণিত কয়েকটি বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করা হয়ে থাকে। ফলে, ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ ধারণাটির প্রস্তাবক ও প্রচারকেরা প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্বকে নিছকই একটি তত্ত্ব এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত কোনো বিষয় নয় বলে একে নাকচ করে দিতে সচেষ্ট থাকেন।

ক≠খ?

প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ত্ব কেবলই একটি তত্ত্ব হয়ে থাকলে বিগ ব্যাং তত্ত্বও তো নিছক একটি তত্ত্ব বৈ কিছু নয়। নির্দিষ্ট একটি তত্ত্ব উদ্ধৃত করে কুরআনের কতিপয় বক্তব্যের ‘সত্যতা’ প্রমাণের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, কিন্তু একইসাথে বিজ্ঞানের শক্তিশালী আরেকটি তত্ত্বকে পুরোপুরি অবজ্ঞা করা আদতে এক ধরণের দ্বিচারিতা।

বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে তা সম্পর্কে যিনি ভালোভাবে অবগত নন তিনি ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ ঘরানার লেখা পড়ে ও লেকচার শুনে যতই মুগ্ধ হোন না কেন, বিজ্ঞানের অন্দরমহলের খবর যারা রাখেন তাদের অনেকের কাছে পুরো বিষয়টি মুগ্ধতার বদলে অস্বস্তিকর। ঈমান আগে থেকেই নড়বড়ে হয়ে থাকলে এসব লেখা পড়ে তাদের কারও কারও অজ্ঞেয়বাদী বা নাস্তিক হয়ে পড়াও অসম্ভব নয়।

বিজ্ঞান যেভাবে কাজ করে:

বিজ্ঞানের জগতে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে গবেষণা ও অনুসন্ধান চালানো হয়। খুবই সংক্ষেপে বললে বিজ্ঞান গবেষণাপদ্ধতির প্রধান ধাপসমূহ হলো:
১. সমস্যার শনাক্তকরণ (identification of the problem)
২. পটভূমি গবেষণা (conduct background research)
৩. অনুসিদ্ধান্ত গঠণ (form a hypothesis)
৪. গবেষণা পরিকল্পনা (plan experiment)
৫. গবেষণা পরিচালনা (perform experiment)
৬. তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ (analyze data)
৭. উপসংহার চুড়ান্তকরণ (form a conclusion)
৮. গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা (communicate results)

সুনির্দিষ্ট যে বিষয়বস্তুটি নিয়ে গবেষণা করতে চাওয়া হচ্ছে তাকে বিজ্ঞানের ভাষায় সমস্যা বলে। সমস্যাটির গভীরে যেতে হলে সেই বিষয়ে এখন পর্যন্ত যত গবেষণা হয়েছে তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা একজন গবেষকের জন্য অপরিহার্য। এরই ভিত্তিতে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্নাবলী (research questions) চুড়ান্ত করা হয় যার উত্তর পাওয়া গবেষণাটির মূল উদ্দেশ্য। সেখান থেকে সত্যতা বা অসত্যতা নির্ণয়ের জন্য এক বা একাধিক অনুসিদ্ধান্ত (hypothesis) চুড়ান্ত করা হয়। সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করে গবেষণাকর্মটি চলতে থাকে, যেখান থেকে নানাবিধ তথ্য ও উপাত্ত হাতে আসে। এসব তথ্য ও উপাত্তকে বিস্তারিত আকারে বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে যুক্তিসঙ্গত একটি উপসংহারে পৌঁছানোর চেষ্টা চলে। উপসংহার চুড়ান্ত হলে পিয়ার রিভিউড পাবলিকেশনে গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা এই বিষয়ে ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য লিটারেচার রিভিউ ম্যাটেরিয়াল হিসেবে কাজ করে। এভাবে জ্ঞানের চর্চা এগিয়ে যেতে থাকে।

জ্ঞানের এই অনুসন্ধিৎসা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এখানে শেষ কথা বলে কিছু নেই। আজকের কোনো একটি গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে আরেকটি গবেষণার মাধ্যমে খন্ডন করা হতে পারে। পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধন বিজ্ঞানের জগতে খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা।

বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে প্রমাণ করতে যাওয়ার সম্ভাব্য বিপদ:

বিজ্ঞানী টলেমি (১০০-১৭০ খ্রিস্টাব্দ)-র মতে, পৃথিবী হলো মহাবিশ্বের কেন্দ্র এবং চাঁদ, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্ররাজি পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে। বিজ্ঞানী কোপার্নিকাস (১৪৭৩-১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দ) এর ঠিক বিপরীত এক তত্ত্ব নিয়ে হাজির হন। তার মতে, সূর্য হলো মহাবিশ্বের কেন্দ্র, যেখানে পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহসমূহ সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, আর চাঁদ ঘোরে পৃথিবীকে কেন্দ্র করে। কোপার্নিকাসের তত্ত্ব অনুযায়ী সূর্য ও মহাকাশের অন্যান্য নক্ষত্রসমূহ কাউকে কেন্দ্র করে ঘোরে না, বরং তারা স্থির।

আজকের দিনের জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞান অনুযায়ী টলেমির তত্ত্ব তো ভুলই, এমনকি কোপার্নিকাসের তত্ত্বেও অনেক ত্রুটি আছে। এখনকার বিজ্ঞানীদের মতে, সূর্য ও অন্যান্য নক্ষত্ররাজিও তাদের নিজ নিজ কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছে। কয়েক শতাব্দী পরে হয়তো বর্তমান সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানের জ্ঞানেও অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি বের হবে।

পৃথিবী মহাবিশ্বের কেন্দ্র ও বাদবাকি সবকিছু পৃথিবীকে কেন্দ্র করে প্রদক্ষিণ করছে – এটাই ছিলো টলেমি ও তার পরবর্তী যুগের বিজ্ঞান। ধরা যাক, তদানীন্তন বিজ্ঞানের এই জ্ঞানকে ভিত্তি হিসেবে ধরে ১২১২ খ্রিস্টাব্দে কুরআনের কয়েকটি আয়াতের ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা’ করা হয়েছে। এর তিন শতাব্দী পরে কোপার্নিকাস এসে এই ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার’ ভিত্তিমূলেই আঘাত করলেন। তাহলে, তিন শতাব্দী আগে করা ত্রুটিপূর্ণ একটি ‘বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার’ কারণে কুরআনের ওই আয়াতসমূহ কি ‘অবৈজ্ঞানিক’ বা ‘অসত্য’ বলে সাব্যস্ত হবে?

কোপার্নিকাস-পরবর্তী যুগের জন্যও এই একই কথা প্রযোজ্য। ২০১৯ সালের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভিত্তিতে ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ বলে প্রতিপন্ন হওয়া অনেক বিষয় ২১১৯ সালে ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ বলে পরিগণিত হতে পারে। তাই বলে কুরআনে তো আর কোনো পরিবর্তন আসবে না!

বিজ্ঞান ও ধর্ম একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়:

বিজ্ঞান কাজ করে সৃষ্টিজগত নিয়ে। ‘কীভাবে’ (how) প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার মধ্যেই বিজ্ঞানের গন্ডি সীমাবদ্ধ। অন্যদিকে, ধর্ম মূলত ‘কেন’ (why) প্রশ্নের উত্তর দেয়। বিজ্ঞান যেখানে physical জগত নিয়ে জিজ্ঞাসার জবাব দেয়, ধর্ম সেখানে কথা বলে metaphysical বাস্তবতা নিয়ে। বিজ্ঞানের দৌড় শরীর পর্যন্ত, রূহের জগতে তার প্রবেশাধিকার নেই। ফলে, বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মের ‘সত্যতা’ প্রমাণে সচেষ্ট থাকা বা বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে ‘বাতিল’ করে দিতে চাওয়া উভয়ই অযৌক্তিক।

তাওহীদ (আল্লাহর একত্ব ও এককত্ব), রিসালাত (ঐশী বাণী ও বার্তাবাহক) ও আখিরাত (পরকাল) – এই তিনটি স্তম্ভ হলো ইসলামী ধর্মবিশ্বাসের প্রধানতম ভিত্তি। এগুলো গাইব বা অদৃশ্য জগতের বিষয়। বিজ্ঞান যে পদ্ধতিতে কাজ করে তাকে ব্যবহার করে এই তিনটি বিষয়ের পক্ষে বা বিপক্ষে বস্তুনিষ্ঠ কোনো উপসংহারে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

বিজ্ঞান অদৃশ্য জগতের নাগাল না পেলেও তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত যুক্তিবিরোধী কোনো বিশ্বাসও নয়। মানুষ যদি তার ফিতরত বা স্বভাবজাত প্রবৃত্তির ওপর বহাল থাকে তাহলে এই তিনটি বিষয়ের যৌক্তিকতা তার অনুধাবন করতে পারার কথা।

তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ নিয়ে যারা কাজ করেছেন এবং যারা একে জনপ্রিয় করেছেন তাদের সবাইকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন। তবে, বিজ্ঞানের জ্ঞান সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তনশীল হওয়ার কারণে ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিষ্ময়’ অভিধায় যেসব বিষয়কে আজ অভিহিত করা হচ্ছে তার অনেক কিছুই আগামীতে পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। আর তাই আল্লাহর নাযিল করা সর্বশেষ আসমানী কিতাব কুরআনকে ক্রমপরিবর্তনশীল বিজ্ঞানের নিক্তি দিয়ে মাপার চেষ্টা না করাই উত্তম।

Advertisements

__ATA.cmd.push(function() {
__ATA.initSlot(‘atatags-26942-5c970aa1b2187’, {
collapseEmpty: ‘before’,
sectionId: ‘26942’,
width: 300,
height: 250
});
});

__ATA.cmd.push(function() {
__ATA.initSlot(‘atatags-114160-5c970aa1b2189’, {
collapseEmpty: ‘before’,
sectionId: ‘114160’,
width: 300,
height: 250
});
});

Updated: March 24, 2019 — 4:42 am

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *